সংসদের বাইরে ‘সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ’ গড়ছে জামায়াত জোট
সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সংসদের বাইরে বিকল্প উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। এ লক্ষ্যে ‘সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ’ গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জোটটি। পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের খসড়া রূপরেখা তৈরি, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণ এবং এ বিষয়ে জনমত গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১-দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, সরকার গণভোটের রায়ের প্রতি অবজ্ঞা দেখাচ্ছে এবং সংস্কারের অঙ্গীকার থেকে সরে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে গণভোটের রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁরা নিজেদের উদ্যোগে পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি বলেন, পরিষদ গঠনের বিষয়ে ১১ দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এর সদস্যসংখ্যা, কাঠামো ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। জোটের সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি শরিক দলগুলোর প্রতিনিধিদেরও এতে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিষদে যাঁরা থাকতে পারেন
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ জানান, গত ২৭ অক্টোবর ১১-দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। পরদিন এ বিষয়ে জোটের লিয়াজোঁ কমিটিও বৈঠক করে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, জোটের কয়েকজন সংসদ সদস্য এবং প্রতিটি শরিক দল থেকে সংসদ সদস্য নন, এমন একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে পরিষদ গঠন করা হতে পারে। পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন জানিয়েছেন, এ জন্য ১৫ সদস্যের একটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। তবে জোটের শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার পর তা চূড়ান্ত হবে।
সম্ভাব্য সদস্যদের তালিকায় রয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন, বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন, দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আইনজীবী শিশির মনির এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম। তবে এ তালিকা এখনো চূড়ান্ত নয়।
সংস্কারের খসড়া ও জনমত গঠনের পরিকল্পনা
পরিষদের অন্যতম কাজ হবে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা। পাশাপাশি সংবিধান সংস্কারের একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করে তা জনসমক্ষে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ জন্য ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবে পরিষদ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে সেমিনার, আলোচনা সভা ও অন্যান্য কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, ১১-দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। ফলে সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়ে তাঁদের দায়বদ্ধতা রয়েছে।
নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের আলোকে সংবিধান কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে একটি খসড়া তুলে ধরতে চান তাঁরা। পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরিতে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হবে।
বিশেষ কমিটি নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিরোধ
সংবিধান সংস্কারের পদ্ধতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে মতপার্থক্য থেকেই নতুন এ উদ্যোগের সূত্রপাত।
গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি সদস্যপদ খালি রাখা হলেও জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কোনো সদস্যের নাম প্রস্তাব করেনি।
বিরোধী দলের নেতাদের বক্তব্য, তাঁরা সংবিধান সংশোধনের পরিবর্তে জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়ন চান। এ কারণে সরকারের গঠিত বিশেষ কমিটির কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন না তাঁরা।
গত ৪ আগস্ট বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে ২০ সেপ্টেম্বর জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের কোনো শরিক দল তাতে অংশ নেয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করে। দীর্ঘ আলোচনা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ গৃহীত হয়।
পরে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা হয়। এর ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট সংস্কারের পক্ষে পড়ে।
তবে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। বিএনপি সরকার সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে অনড় রয়েছে।
এই মতপার্থক্যের মধ্যেই সংসদের বাইরে নিজেদের উদ্যোগে সংস্কারের রূপরেখা তৈরি ও জনমত গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে ১১-দলীয় ঐক্য।
