হিমছড়িতে সাগরের স্রোতে প্রাণ গেল ৫ পর্যটকের, ২৭ ঘণ্টা পর মিলল শেষ মরদেহ
কক্সবাজারের হিমছড়ি সৈকতে গোসল করতে নেমে সাগরের প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া পাঁচ পর্যটকেরই মৃত্যু হয়েছে। বুধবার বিকেলে শুরু হওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সর্বশেষ নিখোঁজ পর্যটক এস এম নাফিসুর রহমান নিবিড়ের মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উদ্ধার অভিযান। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২৭ ঘণ্টা পর তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে সমুদ্রসৈকতের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পর্যটকদের সতর্কতা নিয়ে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে কক্সবাজার শহরের কলাতলী সৈকতের ভাঙার মোড় এলাকায় এক্সোটিকা সাম্পানের কাছ থেকে নিবিড়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় লোকজন সৈকতে মরদেহটি দেখতে পেয়ে বিচকর্মী ও লাইফগার্ডদের খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে।
রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে ফজলুল হক মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নিহত নিবিড় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর বাড়ি ঢাকার আজিমপুর এলাকায়।
যেভাবে ঘটল মর্মান্তিক দুর্ঘটনা
গত বুধবার, ২১ অক্টোবর বিকেলে হিমছড়ির পেঁচারদ্বীপ এলাকায় মেরিনা রিসোর্টের জাদুঘরসংলগ্ন সৈকতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বিকেল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে কয়েকজন পর্যটক সাগরে গোসল করতে নামেন। একপর্যায়ে প্রবল স্রোত ও জোয়ারের পানিতে তাঁরা ভেসে যান।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যটকদের দুটি দল রেজু খাল পেরিয়ে সমুদ্র ও খালের মোহনায় জেগে ওঠা একটি বালুচরে বেড়াতে গিয়েছিলেন। বিকেলের দিকে জোয়ারের পানি বাড়তে শুরু করলে বালুচরটি ধীরে ধীরে পানির নিচে তলিয়ে যায়। পর্যটকেরা বিপদের বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই পুরো চরটি পানিতে ডুবে যায়। এতে তাঁরা সাগরের পানিতে আটকা পড়েন এবং কয়েকজন প্রবল স্রোতে ভেসে যান।
প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা, বিচকর্মী ও লাইফগার্ডরা উদ্ধারকাজ শুরু করেন। বুধবার সন্ধ্যার মধ্যেই তিন পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে বৃহস্পতিবার সকালে মোহাম্মদ হারুন নামে আরেক পর্যটকের মরদেহ পাওয়া যায়। সর্বশেষ সন্ধ্যায় নিবিড়ের মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে মৃতের সংখ্যা পাঁচে পৌঁছায়।
কারা প্রাণ হারালেন
এ ঘটনায় নিহত পাঁচ পর্যটকের মধ্যে রয়েছেন আল মাহিবুল ইবনে মোকারম রোহান, সাইবুল হক জিসান, মোহাম্মদ আকাশ, মোহাম্মদ হারুন ও এস এম নাফিসুর রহমান নিবিড়।
নিহতদের মধ্যে ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা এবং চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার তরুণ রয়েছেন। তাঁদের কয়েকজন শিক্ষার্থী ছিলেন। অন্যদিকে, দুর্ঘটনার পর জীবিত উদ্ধার হওয়া কয়েকজনকে চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পর্যটকদের দুটি দলের সদস্যরা একই এলাকায় অবস্থান করছিলেন। একটি দলের সদস্য বিপদে পড়লে অন্যরা তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে যান বলে কয়েকটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে উদ্ধারকারীদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পরিস্থিতি না থাকায় ঘটনাটি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
সাঁতার না জানা এবং জোয়ারের ঝুঁকি
এ দুর্ঘটনার অন্যতম উদ্বেগজনক দিক হলো, পর্যটকদের কেউ কেউ সাঁতার জানতেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। অপরদিকে, সমুদ্র ও খালের মোহনায় জোয়ারের কারণে পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়তে থাকায় বালুচরটি নিরাপদ অবস্থান থেকে বিপজ্জনক স্থানে পরিণত হয়।
সৈকতের পরিবেশ সব সময় একই রকম থাকে না। ভাটার সময় দৃশ্যমান বালুচর জোয়ারের সময় পানির নিচে চলে যেতে পারে। পাশাপাশি সমুদ্রের তলদেশের গঠন, ঢেউয়ের শক্তি এবং পানির নিচের স্রোত সম্পর্কে ধারণা না থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিপদের মুখে পড়তে পারেন পর্যটকেরা।
বিশেষজ্ঞদের সাধারণ নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুযায়ী, সমুদ্রে গোসলের সময় স্থানীয় প্রশাসন ও লাইফগার্ডের নির্দেশনা অনুসরণ করা, নিষিদ্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না নামা এবং সাঁতার না জানলে গভীর পানিতে প্রবেশ না করা জরুরি। স্রোতে কেউ ভেসে গেলে নিজের নিরাপত্তা উপেক্ষা করে সরাসরি পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার পরিবর্তে দ্রুত লাইফগার্ড বা প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীর সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।
সৈকতের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
কক্সবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটক এই সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণ করেন। ফলে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট উদ্ধারসেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
হিমছড়ির এ ঘটনা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, জোয়ারের সময়সংক্রান্ত তথ্য, পর্যাপ্ত লাইফগার্ড এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পর্যটকেরা খাল পেরিয়ে বালুচরে যান, সেখানে জোয়ারের ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
পাঁচ পর্যটকের মৃত্যু শুধু কয়েকটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে পর্যটকদের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশাসনিক নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং উদ্ধারসেবার সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি।
