হরমুজ প্রণালির কাছে সামরিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া, বাড়ছে নৌ ইউনিটের সদস্যও

৬ মিনিটে পড়ুন২ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় নিজেদের সামুদ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। এ লক্ষ্যে দেশটির দীর্ঘদিনের জলদস্যুবিরোধী নৌ ইউনিট ‘চেওংহে’র (Cheonghae Unit) কার্যপরিধি ও জনবল বাড়ানো হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনায় একটি পি-৮এ পসেইডন সামুদ্রিক টহল বিমান, বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী দল এবং মনুষ্যবিহীন মাইন শনাক্ত ও অপসারণের সরঞ্জাম যুক্ত করার কথা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়। সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউনিটটির কার্যক্রম ওমানের দক্ষিণ উপকূলের দুকম বন্দরের কাছাকাছি জলসীমা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে। এলাকাটি হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার দূরে।

সদস্যসংখ্যা বাড়বে ৭৫, যুক্ত হবে আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম

নতুন পরিকল্পনায় চেওংহে ইউনিটে আরও ৭৫ জন সদস্য যুক্ত করা হবে। এতে ইউনিটটির অনুমোদিত জনবল ৩২০ থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ৩৯৫ জনে দাঁড়াবে।

নতুন সরঞ্জামের মধ্যে থাকবে পি-৮এ পসেইডন সামুদ্রিক টহল বিমান, বিস্ফোরক শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার জন্য বিশেষজ্ঞ দল এবং মনুষ্যবিহীন জলযান। এসব সরঞ্জামের মাধ্যমে সমুদ্রতলের মাইন শনাক্ত, পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে অপসারণের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন বিমান ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম যুক্ত করার পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাও ইউনিটটির সম্প্রসারিত দায়িত্বের অংশ হবে।

হরমুজে সরাসরি প্রবেশের পরিকল্পনা নয়

দক্ষিণ কোরিয়ার এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইউনিটটির নতুন কার্যপরিধিতে হরমুজ প্রণালি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। বরং ওমানের দক্ষিণ উপকূলের উন্মুক্ত জলসীমায় তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকবে।

দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ সম্প্রসারণের মূল উদ্দেশ্য দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক, বাণিজ্যিক জাহাজ ও অর্থনৈতিক স্বার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ইউনিটটি দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব সামরিক কমান্ডের অধীনেই স্বাধীনভাবে কাজ করবে। ইরানের ভূখণ্ড, আঞ্চলিক জলসীমা কিংবা হরমুজ প্রণালির অভ্যন্তরে নজরদারি বা সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনাও নেই।

তবে ভবিষ্যতে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান হলে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালির সমুদ্রপথ থেকে মাইন অপসারণে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এ ধরনের কোনো কার্যক্রমে অংশ নিতে হলে পৃথক সংসদীয় অনুমোদন এবং নিরাপদ পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

২০০৯ সাল থেকে জলদস্যুবিরোধী অভিযানে দক্ষিণ কোরিয়া

দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর চেওংহে ইউনিট ২০০৯ সাল থেকে এডেন উপসাগরে জলদস্যুবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সোমালিয়ার উপকূলসংলগ্ন এই সমুদ্রপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে ইউনিটটির প্রধান সামরিক সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে ৪ হাজার ৪০০ টনের একটি ডেস্ট্রয়ার, একটি সামুদ্রিক হেলিকপ্টার এবং দ্রুতগতির কয়েকটি নৌযান। বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়া এবং সমুদ্রপথে দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এর অন্যতম দায়িত্ব।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যেখানে জলদস্যুতার ১১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত তা বেড়ে ৩৬টিতে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ জলসীমায় মনোযোগ দেওয়ায় সোমালিয়ার উপকূলেও জলদস্যুদের তৎপরতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নতুন পরিকল্পনায় জলদস্যুবিরোধী কার্যক্রমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথে অবাধ চলাচল পুনরুদ্ধারে সহযোগিতার বিষয়টিও যুক্ত করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক স্বার্থ

হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন উদ্যোগের পেছনে কেবল সামরিক বিবেচনাই নয়, রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণ।

দক্ষিণ কোরিয়া তার জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। ২০২৫ সালে দেশটির মোট তেল আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ এসেছিল মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যার অধিকাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। ফলে এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা দেশটির জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতায় দক্ষিণ কোরিয়ার আরও সহযোগিতা চেয়েছেন। ওয়াশিংটনের মতে, কৌশলগত এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতে মিত্র দেশগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এর আগে স্পষ্ট করেছিলেন, এমন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে না, যা দেশটিকে সরাসরি বিদেশি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে।

এ কারণে নতুন পরিকল্পনাটিকে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের পরিবর্তে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক মাইন অপসারণ কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে উপস্থাপন করছে সিউল।

সংসদীয় অনুমোদনের অপেক্ষায় নতুন পরিকল্পনা

দক্ষিণ কোরিয়ার আইন অনুযায়ী, বিদেশে সামরিক বাহিনী মোতায়েন কিংবা বিদ্যমান কোনো সামরিক ইউনিটের কার্যপরিধি সম্প্রসারণের জন্য জাতীয় সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন।

বৃহস্পতিবারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পরিকল্পনাটি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় এগিয়েছে। আগামী সপ্তাহে মন্ত্রিসভার পর্যালোচনা ও প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের পর সংশোধিত প্রস্তাব জাতীয় সংসদে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সংসদের সম্মতি ছাড়া সম্প্রসারিত কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে না।

দক্ষিণ কোরিয়ার এ সিদ্ধান্তে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তায় দেশটির ভূমিকা বাড়ানোর প্রস্তুতি স্পষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে না পড়ার অবস্থানও বজায় রাখার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।