যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে উভয় কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের ভূমিধস জয়
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টিকে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে ফেলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—দুই জায়গাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। এ ফলাফলকে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মার্কিন ভোটারদের বড় ধরনের রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনের ফলাফলে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত একাধিক অঙ্গরাজ্যেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। বিশেষ করে টেক্সাস, কানসাস, সাউথ ক্যারোলাইনা ও আইওয়ার মতো রাজ্যে তাদের সাফল্য এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হতে যাচ্ছে।
সিনেটে সাতটি আসন নিজেদের দখলে নিল ডেমোক্র্যাটরা
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের মোট আসন ১০০টি। এবারের নির্বাচনে ৩৫টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যগুলোর একটি হলো রিপাবলিকানদের কাছ থেকে অন্তত সাতটি আসন ছিনিয়ে নেওয়া।
কানসাসে অ্যাডাম হ্যামিলটন, আইওয়ায় জশ টুরেক, টেক্সাসে জেমস তালারিকো, ওহাইওতে শেরড ব্রাউন, মেইনে ট্রয় জ্যাকসন, নর্থ ক্যারোলাইনায় রয় কুপার এবং সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যানি অ্যান্ড্রুজের জয় ডেমোক্র্যাটদের সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এর মধ্যে কানসাসের ফলাফল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় ৯৪ বছর পর রাজ্যটি থেকে একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে টেক্সাসে কয়েক দশকের রাজনৈতিক অবস্থান ভেঙে ডেমোক্র্যাটদের জয় দলটির জন্য বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মেইনে দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ট্রয় জ্যাকসন। কলিন্সের পরাজয়কে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া মিশিগানে আবদুল এল-সাইয়েদের জয়ও আলোচনায় এসেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাল রিপাবলিকানরা
কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসনে এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন। নির্বাচনের ফলাফলে ডেমোক্র্যাটরা প্রয়োজনীয় আসনসংখ্যা অতিক্রম করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছেন।
প্রাথমিক ফলাফলে দলটি দুই ডজনের বেশি আসন নিজেদের পক্ষে নিতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে এমন কয়েকটি নির্বাচনী এলাকাও রয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
আইওয়া, টেক্সাস, ফ্লোরিডা ও পেনসিলভানিয়ার পাশাপাশি কেনটাকি, মিসৌরি, নেব্রাস্কা, ওহাইও ও ইউটাহ অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাটদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আইওয়ায় আগে চারটি আসনই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এবারের নির্বাচনে তিনটি আসনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, প্রতিনিধি পরিষদে এই সাফল্য শুধু আসনসংখ্যার পরিবর্তন নয়; বরং ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন থাকা অনেক নির্বাচনী এলাকাতেও রাজনৈতিক মনোভাব পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক চাপ ও ইরান যুদ্ধ নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে
এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, ইরান যুদ্ধ, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং সরকারি দুর্নীতি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনী প্রচারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য, পরিবারের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং প্রশাসনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এবং ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে প্রশ্নও প্রচারের অংশ ছিল।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানকে সামনে এনে তাদের চরমপন্থী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। তবে নির্বাচনী জরিপ ও ভোটারদের মতামতে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে উঠে এসেছে।
নির্বাচন-পরবর্তী জরিপ অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ভোটার এবারের নির্বাচনকে ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ অথবা অসন্তুষ্ট ছিলেন। এ ছাড়া ৭০ শতাংশ ভোটার মনে করেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় কংগ্রেসের আরও সক্রিয় ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।
তরুণ ও হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যেও রিপাবলিকানদের সমর্থন কমার প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে টেক্সাস ও কানসাসের হিস্পানিক অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি নির্বাচনের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব গ্রহণ করলে প্রশাসনের আইন প্রণয়ন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্টের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা ও বিচারপতিদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে প্রশাসনের কার্যক্রম, সরকারি ব্যয় এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর তদন্ত ও নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ডেমোক্র্যাট নেতারা ইতোমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম এবং তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে তদন্তের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হলেই প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না। ট্রাম্পের হাতে আইন অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকায় গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস নতুন স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। তিনি নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বে থাকবেন চাক শুমার।
পরাজয় স্বীকার করলেন ট্রাম্প, তবে ফলকে ব্যক্তিগত ধাক্কা বলতে নারাজ
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে ফলাফলকে নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখতে রাজি নন তিনি।
এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ডেমোক্র্যাটরা ভালো প্রচারণা চালিয়েছে এবং তাদের প্রার্থীরা কঠোর পরিশ্রম করেছে। একই সঙ্গে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থীদের দুর্বলতাকে পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসে পাস হওয়া তাঁর ভাষায় ‘অগ্রহণযোগ্য’ কোনো বিল তিনি ভেটো দিতে পারেন বলেও জানিয়েছেন।
রিপাবলিকান সিনেট নেতা জন থুনও ডেমোক্র্যাটদের নীতিগত অবস্থানের বিরোধিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে নতুন কংগ্রেসে দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরেও নতুন হিসাব
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাংবিধানিকভাবে ট্রাম্প তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারবেন না। ফলে রিপাবলিকান দলেও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্য দলটির সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ও হিস্পানিক ভোটারদের সমর্থন ফিরে পাওয়া এবং রিপাবলিকানদের শক্তিশালী অঙ্গরাজ্যে জয় দলটির জন্য নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী, নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হবে আগামী ৩ জানুয়ারি ২০২৭। সেদিন থেকে ডেমোক্র্যাটরা আনুষ্ঠানিকভাবে উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দায়িত্ব পালন শুরু করবেন। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের মধ্যে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হতে যাচ্ছে।
