ফ্রান্সজুড়ে ধর্মঘট-বিক্ষোভ, অংশ নিতে পারেন ৭ লাখ ৮০ হাজার মানুষ
ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, মজুরি বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবায় বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভ ও ধর্মঘট শুরু হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর ডাকে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দেশটির বিভিন্ন শহরে রাজপথে নামছেন শ্রমিক, সরকারি কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। সম্ভাব্য বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ৭ লাখ ৮০ হাজারে পৌঁছাতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারা দেশে ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডার্ম মোতায়েন করেছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ।
ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্যারিসের বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলে ৫ লাখ থেকে ৭ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিতে পারেন। রাজধানী প্যারিসে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার হতে পারে। এসব হিসাবের সর্বোচ্চ সীমা যোগ করলে সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ লাখ ৮০ হাজারে। তবে এটি পূর্বাভাস, প্রকৃত অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নয়।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও মজুরি নিয়ে অসন্তোষ
ফ্রান্সের চলমান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও পরিষেবার ব্যয় বৃদ্ধি। জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, বাড়িভাড়া, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়লেও সেই তুলনায় মজুরি ও পেনশন না বাড়ায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে শ্রমিকদের মধ্যে।
প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলোর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশটি অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা বাড়ছে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় সংকোচনের প্রস্তাব, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ কমানো এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন স্থবির রাখার উদ্যোগের বিরোধিতা করছে সংগঠনগুলো।
আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে ফ্রান্সের প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলো। এর মধ্যে রয়েছে সিজিটি (CGT), সিএফডিটি (CFDT), ফোর্স উভরিয়ের (FO) এবং অন্যান্য শ্রমিক ফেডারেশন।
শ্রমিকদের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, রেলকর্মী, হাসপাতালকর্মী, ডাক বিভাগের কর্মচারী এবং বিমান চলাচল খাতের কর্মীরাও ধর্মঘটে অংশ নিচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও নতুন মাত্রা
চলমান বিক্ষোভের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মীসংকট এবং শিক্ষা পরিবেশের অবনতির প্রতিবাদে আন্দোলনের সূচনা হয়।
পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ, জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ভবন, শিক্ষকসংকট এবং শিক্ষায় পর্যাপ্ত সরকারি অর্থ বরাদ্দের দাবিতে আন্দোলনে যুক্ত হয়। বর্তমানে মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক সংগঠনগুলোও কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই প্যারিস, মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীদের অবরোধ ও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। প্যারিসের কয়েকটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা প্রবেশপথ বন্ধ করে প্রতিবাদ জানায়।
নিরাপত্তায় ৭০ হাজার পুলিশ, সাঁজোয়া যান ও ড্রোন
১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটার পর থেকে ফরাসি কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবারের কর্মসূচিতে ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডার্ম দায়িত্ব পালন করবেন। নিরাপত্তা কার্যক্রমে সাঁজোয়া যান, জলকামান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের আড়ালে কিছু সহিংস গোষ্ঠী পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, বাণিজ্যিক এলাকা এবং সংবেদনশীল স্থানে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্যারিসে বিক্ষোভের পথ নিয়ে আইনি বিরোধ
রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভের মিছিল কোন পথে যাবে, তা নিয়ে আয়োজক ও প্রশাসনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। শ্রমিক ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো বাস্তিল স্কয়ার থেকে কনকর্ড স্কয়ার পর্যন্ত মিছিল করার অনুমতি চেয়েছিল।
তবে নিরাপত্তাঝুঁকির কথা উল্লেখ করে পুলিশ কর্তৃপক্ষ ওই পথের পরিবর্তে রিপাবলিক স্কয়ার থেকে নাসিওঁ স্কয়ার পর্যন্ত বিকল্প রুট নির্ধারণ করে। আয়োজকেরা প্রশাসনিক আদালতে এর বিরুদ্ধে আবেদন করলেও আদালত পুলিশের নির্ধারিত পথ বহাল রাখে। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ওই পথে মিছিল হওয়ার কথা রয়েছে।
রেল ও পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্নের আশঙ্কা
ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে দেশটির পরিবহন খাতেও। ফ্রান্সের জাতীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এসএনসিএফ জানিয়েছে, আঞ্চলিক রেল যোগাযোগে উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন ঘটতে পারে। প্যারিসের আশপাশের কয়েকটি শহরতলির রেলপথ এবং আন্তশহর ট্রেন চলাচলেও প্রভাব পড়বে।
তবে দূরপাল্লার উচ্চগতির টিজিভি (TGV) ট্রেনের চলাচল তুলনামূলক স্বাভাবিক রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রতি ১০টি টিজিভি ট্রেনের মধ্যে ৯টি চলাচল করতে পারে। রেলপথ ছাড়াও বন্দর, ডাক বিভাগ ও শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্নের আশঙ্কা রয়েছে।
ফ্রান্সে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ধারাবাহিক বিক্ষোভের মধ্যে এবারের ধর্মঘটকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো বেতন ও পেনশন বৃদ্ধি, সরকারি পরিষেবায় বিনিয়োগ এবং প্রস্তাবিত ব্যয় সংকোচন নীতি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে সরকার বিক্ষোভ মোকাবিলায় নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
