৮৩৬ পর্যটক নিয়ে সেন্টমার্টিনের পথে মৌসুমের প্রথম জাহাজ, মানতে হবে যেসব নিয়ম
প্রশাসনিক অনুমোদন ও জাহাজ চলাচল নিয়ে কয়েক দিনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌপথে পর্যটক পরিবহন শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে ৮৩৬ জন পর্যটক নিয়ে চলতি মৌসুমের প্রথম জাহাজ এমভি বার আউলিয়া প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করে। এর মধ্য দিয়ে নির্ধারিত সময়ের চার দিন পর সচল হলো দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপে পর্যটক পরিবহনের নৌপথ।
সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে জাহাজটি ছেড়ে যায়। ভোর থেকেই সেখানে পর্যটকদের ভিড় জমতে থাকে। পরিবার, বন্ধু ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অনেকে মৌসুমের প্রথম যাত্রায় অংশ নেন।
অনুমোদন জটিলতায় পিছিয়েছে যাত্রা
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াতের সুযোগ চালু হওয়ার কথা ছিল। তবে জাহাজ পরিচালনার প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি অনুমোদন সম্পন্ন না হওয়ায় নির্ধারিত দিনে নৌযান চলাচল শুরু করা সম্ভব হয়নি।
জাহাজ পরিচালনার জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অনুমোদন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) রুট পারমিট এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সম্মতির প্রয়োজন ছিল।
সি ক্রুজ অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে তিনটি জাহাজ পরিচালনার অনুমতি পেয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে প্রথম দিন শুধু এমভি বার আউলিয়া পর্যটক নিয়ে যাত্রা শুরু করে। পর্যায়ক্রমে অন্য দুটি জাহাজও চলাচলে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
তিন জাহাজে ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮
অনুমোদন পাওয়া তিনটি জাহাজের সম্মিলিত যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এমভি বার আউলিয়ার ধারণক্ষমতা ৮৫০, এমভি কর্ণফুলীর ৭৩২ এবং এমভি টেকনাফের ৭১৬ জন।
জাহাজগুলো কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া ঘাট থেকে যাত্রী পরিবহন করবে। পর্যটকের চাহিদা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে তিনটি জাহাজ চালু হলে দ্বীপে যাতায়াতের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
পর্যটকদের জন্য যেসব নিয়ম বাধ্যতামূলক
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এবার সেন্টমার্টিন ভ্রমণে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা দ্বীপটি ভ্রমণের পাশাপাশি সেখানে রাতযাপনও করতে পারবেন।
তবে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। এ ছাড়া ভ্রমণের জন্য ট্রাভেল পাস এবং কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় রাতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টি আয়োজন নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচা এবং ছেঁড়াদ্বীপে যাতায়াতের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, সামুদ্রিক কাছিমসহ দ্বীপের অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়—এমন কর্মকাণ্ড থেকেও পর্যটকদের বিরত থাকতে হবে। সৈকতে মোটরসাইকেল ও সি-বাইকসহ যানবাহন চলাচলও নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।
যাত্রার আগে তল্লাশি, আটকে দেওয়া হলো প্লাস্টিক ও সাউন্ডবক্স
প্রথম দিনের যাত্রায় পরিবেশগত বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে ঘাটে তদারকি চালিয়েছে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ ও কোস্ট গার্ড।
যাত্রীদের সঙ্গে থাকা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও কয়েকটি সাউন্ডবক্স জাহাজে নিতে দেওয়া হয়নি। কোস্ট গার্ডের সদস্যরা মাইকিংয়ের মাধ্যমে পর্যটকদের পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতন করেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, দ্বীপে পৌঁছানোর পরও পর্যটকদের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
এদিকে দীর্ঘ অপেক্ষার পর জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় পর্যটকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। একই সঙ্গে দ্বীপের হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও নতুন করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
তবে পর্যটন কার্যক্রম চালুর পাশাপাশি দ্বীপটির নাজুক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় বিধিনিষেধ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিই এবারের মৌসুমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
