ট্রাম্পের নির্বাচনী ধাক্কার পর তেলের বাজারে অস্থিরতা, ইরান যুদ্ধ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) এশীয় লেনদেনের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে গেলেও দিনের পরবর্তী সময়ে আবার দরপতন ঘটে।
বুধবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে (জিএমটি) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আগের দিনের তুলনায় ৭৬ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলার ৩৬ সেন্টে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৬৩ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৯৬ ডলার ৭২ সেন্টে দাঁড়ায়।
তবে দিনের পরবর্তী লেনদেনে বাজারের চিত্র বদলে যায়। সকাল ১০টা ৩৪ মিনিটে (জিএমটি) ব্রেন্টের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলার ৮৫ সেন্টে নেমে আসে। একই সময়ে ডব্লিউটিআইয়ের দাম কমে দাঁড়ায় ৯৪ ডলার ৯১ সেন্টে। অর্থাৎ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সরবরাহসংক্রান্ত উদ্বেগের পাশাপাশি মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতাও তেলের বাজারে ওঠানামা বাড়িয়েছে।
নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্পের ইরাননীতি নিয়ে প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছেন। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ে প্রশাসনের নীতিনির্ধারণ, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে কংগ্রেসের নজরদারি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব থাকার কথা ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন। যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ও পেট্রোলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব গ্রহণের পর ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের সামরিক ব্যয়, যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল এবং সংঘাতের সমাপ্তি নিয়ে আরও জবাবদিহি দাবি করতে পারেন। বিশেষ করে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় ও মার্কিন নাগরিকদের ওপর জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতিতে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসবে। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকলেও কংগ্রেসের তদন্ত, অর্থায়ন ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা প্রশাসনের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সংকট
বিশ্ববাজারে তেলের দামের অস্থিরতার অন্যতম বড় কারণ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের মধ্যে সংযোগকারী এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি রপ্তানি করা হয়। সেখানে জাহাজ চলাচলে বাধা, হামলা কিংবা সামরিক উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
অক্টোবর মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল, কনডেনসেট ও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের সমুদ্রপথে সরবরাহ দৈনিক গড়ে ১ কোটি ৭১ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। সেপ্টেম্বরে এ পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৮৯ লাখ ব্যারেল। যুদ্ধ শুরুর আগের স্বাভাবিক সরবরাহের তুলনায় অক্টোবরের প্রবাহ ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ।
হরমুজ প্রণালির আশপাশে জাহাজে হামলার ঘটনা বাড়ায় অনেক ট্যাংকার নিরাপত্তার কারণে নিজেদের অবস্থান শনাক্তকারী সংকেত বন্ধ রাখছে। ফলে প্রকৃত সরবরাহের পরিমাণ নির্ধারণেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, পরবর্তী সময়ে উপাত্ত সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা চললেও চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা
যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি। কাতারের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে দুই পক্ষ এখনো অনেক দূরে রয়েছে।
ইরানের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে দেশটির বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের তেল বিক্রির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা বাতিল। বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া ও পরবর্তী সময়ে অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর তাৎক্ষণিক কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক হামলা অব্যাহত থাকা এবং একই সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর বক্তব্য দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী অবস্থান নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
মঙ্গলবার ইরানের কেশম দ্বীপে মার্কিন বাহিনী বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা এটিকে মার্কিন সম্পদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা মোকাবিলায় প্রতিরক্ষামূলক অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মজুত কমলেও সরবরাহের চিত্রে মিশ্র সংকেত
তেলের দামকে প্রভাবিত করার আরেকটি বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মজুত। গত ৩০ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত ৫২ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল কমেছে বলে আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের তথ্য উল্লেখ করে বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া আটজন বিশ্লেষক গড়ে ৮ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল মজুত বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। প্রত্যাশার বিপরীতে মজুত কমে যাওয়ায় বাজারে তেলের দামের পক্ষে কিছুটা সমর্থন তৈরি হয়েছে। তবে এটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক উপাত্ত; সরকারি জ্বালানি তথ্য প্রকাশের অপেক্ষা ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহসংক্রান্ত চাপ কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের রপ্তানি এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। ফলে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বাড়লেও ভোক্তাপর্যায়ে জ্বালানির দাম কমতে আরও সময় লাগতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার পরিচালন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য উচ্চ জ্বালানি মূল্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। আবার তেলের দাম বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতির চাপও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
বর্তমানে তেলের বাজারে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্রের মজুত এবং কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি—সবকটি বিষয় একসঙ্গে প্রভাব ফেলছে। ফলে নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের ইরাননীতি কোন দিকে যায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ কতটা স্বাভাবিক হয়, তার ওপর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের পরবর্তী গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করছে।
