গাজীপুরে ষষ্ঠ দিনেও শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, মহাসড়ক অবরোধ ও থানায় হামলার চেষ্টা

৭ মিনিটে পড়ুন৩ বার পড়া হয়েছে

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গাজীপুরের পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ষষ্ঠ দিনেও অব্যাহত রয়েছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার সাইনবোর্ড ও বোর্ডবাজারের বড়বাড়ী এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কয়েক হাজার শ্রমিক। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাঁদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।

একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ বাসন থানার দিকে অগ্রসর হয়ে থানার ভেতরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং হামলার চেষ্টা চালায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিল্পাঞ্চলে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

সকাল থেকেই মহাসড়কে শ্রমিকদের অবস্থান

বুধবার সকাল থেকেই গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জয়দেবপুর এলাকায় শ্রমিকদের একটি অংশ সড়কে অবস্থান নেয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের সরিয়ে দেন।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাছা থানার সাইনবোর্ড এলাকায় দুই থেকে চার হাজার শ্রমিক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। একই সময়ে বোর্ডবাজারের বড়বাড়ী এলাকাতেও শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে শ্রমিকদের মধ্যে ছত্রভঙ্গ হওয়ার পাশাপাশি এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষের মধ্যে কিছু সময় ধরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

বাসন থানায় হামলার চেষ্টা

মহাসড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ বাসন থানার দিকে অগ্রসর হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের কয়েকজন থানার ভেতরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এ সময় লাঠিসোঁটা নিয়ে থানায় হামলার চেষ্টাও করা হয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পরে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।

এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

শিল্প পুলিশের বক্তব্য

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, বুধবার সকাল থেকে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাছা থানা এলাকায় দুই থেকে চার হাজার শ্রমিক সড়কে নেমে আসেন। এ সময় তাঁদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

তিনি জানান, পরে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জয়দেবপুরের দিকেও শ্রমিকেরা অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁদেরও সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

শিল্প পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, সালনা, রাজেন্দ্রপুর, শফিপুর ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কাশিমপুর এলাকায় কিছুটা উত্তেজনা থাকায় সেখানে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

নিরাপত্তায় ২৫ প্লাটুন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী

শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংসতার আশঙ্কায় গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি, আনসার ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মোট ২৫ প্লাটুন সদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন।

এর মধ্যে বিজিবির ১২ প্লাটুন, আনসারের পাঁচ প্লাটুন এবং এসআরবির আট প্লাটুন সদস্য রয়েছেন। এর আগে শিল্পাঞ্চলে বিজিবির ১১ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন ছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় তা বাড়িয়ে ১২ প্লাটুন করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদসহ সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনের সুযোগ থাকলেও সহিংসতা, ভাঙচুর ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

শ্রমিকদের দাবিকে যৌক্তিক বললেন সিটি প্রশাসক

এদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার বুধবার সকালে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থান নেন।

তিনি কাশিমপুর, কোনাবাড়ী, ভোগড়া বাইপাস ও চন্দনা চৌরাস্তা এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় তিনি শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।

এর আগে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে যৌক্তিক উল্লেখ করে শওকত হোসেন সরকার বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনায় সরকার ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তাই ধৈর্য ধরে আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায়ের চেষ্টা করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, শিল্পকারখানা সচল রাখা শ্রমিক, মালিক, গাজীপুর এবং দেশের অর্থনীতির স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পক্ষের উসকানিতে যাতে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলন

পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের মূল দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। বর্তমানে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের অভিযোগ, দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, খাদ্য ও চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরিতে জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়ে আসছেন। গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আহত হয়েছেন।

আন্দোলনের কারণে বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বেশ কিছু কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ

চলমান আন্দোলনের মধ্যে পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর ঘটনাও শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। আন্দোলনের সময় মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করাকে কেন্দ্র করে মারধরের শিকার হওয়ার পর তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবিও উঠেছে।

এদিকে বুধবার অনুষ্ঠিত নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠকে আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকরের বিষয়ে মালিক ও শ্রমিকপক্ষ একমত হয়েছে। তবে নতুন মজুরি কত হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। জানুয়ারি মাসে ডিসেম্বরের বেতনের সঙ্গে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বর্ধিত মজুরি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আন্দোলন, সংঘর্ষ ও কারখানা বন্ধের পরিস্থিতির মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণের আলোচনা চলছে। বুধবার বিকেল পর্যন্ত বাসন থানায় হামলার চেষ্টাসহ বিভিন্ন ঘটনার পর শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার রাখা হয়েছে।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।