দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে স্বল্প বেতনে শ্রমিকদের জীবনযাপন অসম্ভব: শফিকুর রহমান

৬ মিনিটে পড়ুন৩ বার পড়া হয়েছে

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বর্তমান বেতনে পোশাকশ্রমিকদের পক্ষে জীবনযাপন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে জরুরি ভিত্তিতে বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার (৪ নভেম্বর) দলের আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক আন্দোলন, কারখানা বন্ধ এবং শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

শফিকুর রহমান বলেন, বেশ কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকেরা বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করছেন। তাঁদের আন্দোলনের কারণে অনেক কারখানা বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটেছে।

শ্রমিকের মৃত্যুতে নিন্দা, তদন্তের দাবি

গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আহত হয়ে পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেন জামায়াত আমির।

তিনি বলেন, গাইবান্ধার সন্তান পোশাকশ্রমিক তৌফিককে হত্যার ঘটনায় তাঁরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

উল্লেখ্য, গত সোমবার (২ নভেম্বর) গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় গুরুতর আহত হন তৌফিক শেখ (২১)। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় একটি কারখানার সামনে সংঘর্ষের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করার চেষ্টা করলে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়। অন্যদিকে গাজীপুর মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কারখানা বন্ধের দাবিতে বহিরাগতদের চাপ সৃষ্টি এবং কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্যে তিনি আহত হন। ঘটনাটিতে পুলিশের কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি

বর্তমানে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, খাবার ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই মজুরিতে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করছেন শ্রমিকেরা।

এ পরিস্থিতিতে শ্রমিক সংগঠনগুলো ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি রেশনিং ব্যবস্থা চালু, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন ও হত্যার বিচার এবং বিনা কারণে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধের দাবিও জানানো হয়েছে।

শ্রমিকদের আন্দোলন ইতোমধ্যে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনের কারণে কয়েক শ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।

এতে পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মজুরি বোর্ডের বৈঠক, ডিসেম্বর থেকে নতুন কাঠামো কার্যকরের সিদ্ধান্ত

শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে গত ১ নভেম্বর তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার।

বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকরের বিষয়ে একমত হন। সে অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে ডিসেম্বরের বেতনের সঙ্গে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বর্ধিত মজুরি দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।

তবে নতুন মজুরির পরিমাণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। শ্রমিকপক্ষ জানিয়েছে, ডিসেম্বরের মধ্যে মজুরি নির্ধারণের কার্যক্রম সম্পন্ন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে লিখিত প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে।

শ্রমিক ও শিল্প—দুই পক্ষের স্বার্থ রক্ষার আহ্বান

শফিকুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিলে সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে শিল্পের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবন ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, ‘শিল্প বাঁচলে দেশ বাঁচবে, কিন্তু এটাও সমভাবে সত্য যে শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে।’

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংকট সমাধানে মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে যৌক্তিক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সিদ্ধান্ত গ্রহণে যত দেরি হবে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়বে।

অস্থিরতার সুযোগ যেন তৃতীয় পক্ষ নিতে না পারে

শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কোনো তৃতীয় পক্ষ কিংবা সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী যেন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াত আমির।

একই সঙ্গে শ্রমিকদের শান্ত থাকার এবং নিজেদের কর্মস্থল ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়—এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন তিনি।

কারখানার মালিকদের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের শুধু উৎপাদনব্যবস্থার অংশ হিসেবে না দেখে পরিবারের সদস্যের মতো বিবেচনা করতে হবে। তাঁদের সমস্যা ও জীবনযাত্রার বাস্তবতা বুঝে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে তাঁরা অবস্থান করছেন। তবে নিজেদের প্রতিষ্ঠান অক্ষত রাখার বিষয়েও শ্রমিকদের সচেতন থাকতে হবে। কারণ শিল্প টিকে থাকলেই শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুযোগ বজায় থাকবে।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এ শিল্পের বর্তমান অস্থিরতা তাই শুধু শ্রমিক ও মালিকপক্ষের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, রপ্তানি আয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানও জড়িত।

এদিকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকরের সময়সীমা নিয়ে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের মধ্যে ঐকমত্য হলেও মজুরির পরিমাণ চূড়ান্ত না হওয়ায় শ্রমিকদের মূল দাবি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।