পঞ্চম মেয়াদে জয়ী ফিলিস্তিনি-আমেরিকান রাশিদা তালিব, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা

৯ মিনিটে পড়ুন৪ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগানের ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পঞ্চম মেয়াদে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান ডেমোক্র্যাট রাজনীতিক রাশিদা তালিব। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী জেমস ডি হুপারকে পরাজিত করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া কংগ্রেসের যাত্রা আরও দুই বছরের জন্য অব্যাহত রাখলেন এই রাজনীতিক।

বুধবার (৪ নভেম্বর) নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে তাঁর জয় নিশ্চিত হয়েছে। ডেট্রয়েট, ডিয়ারবর্নসহ মিশিগানের ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের বিভিন্ন এলাকার ভোটাররা তাঁকে আবারও নির্বাচিত করেছেন।

রাশিদা তালিব যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের একমাত্র ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সদস্য। একই সঙ্গে তিনি দেশটির প্রথম দুই মুসলিম নারী কংগ্রেস সদস্যের একজন। তাঁর এই জয় মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে মার্কিন রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিতর্কের প্রেক্ষাপটেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

কে এই রাশিদা তালিব?

১৯৭৬ সালের ২৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েটে জন্মগ্রহণ করেন রাশিদা তালিব। তাঁর বাবা-মা ফিলিস্তিন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়েছিলেন। ১৪ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।

স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা শেষে ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ওয়েস্টার্ন মিশিগান ইউনিভার্সিটির থমাস এম কুলি ল স্কুল থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেন।

রাজনীতিতে প্রবেশের আগে তিনি আইনজীবী হিসেবে সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমিক অধিকার এবং নিম্ন আয়ের মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করেছেন।

২০০৮ সালে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েন তিনি। ওই রাজ্য আইনসভায় প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তালিব।

২০১৮ সালের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। একই নির্বাচনে মিনেসোটা থেকে ইলহান ওমরও জয়ী হন। তাঁদের দুজনের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো দুই মুসলিম নারী মার্কিন কংগ্রেসে প্রবেশ করেন।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে টানা চারটি মেয়াদে কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন তালিব। এবার পঞ্চম মেয়াদে নির্বাচিত হলেন তিনি।

কেন তাঁর নির্বাচনী এলাকা গুরুত্বপূর্ণ?

রাশিদা তালিবের নির্বাচনী এলাকা মিশিগানের ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট। এর মধ্যে রয়েছে ডিয়ারবর্ন, ডেট্রয়েটের পশ্চিমাঞ্চল, সাউথফিল্ড, লিভোনিয়া, গার্ডেন সিটি, ইনকস্টার, ওয়েস্টল্যান্ডসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা।

এ অঞ্চলে আরব-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য বসবাস রয়েছে। ২০২৩ সালের আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভে-ভিত্তিক একটি হিসাব অনুযায়ী, জেলাটিতে আরব-আমেরিকান জনসংখ্যা প্রায় ৮২ হাজার ৫০০।

বিশেষ করে ডিয়ারবর্ন শহরটি যুক্তরাষ্ট্রে আরব-আমেরিকান সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে লেবানিজ, ইয়েমেনি, ফিলিস্তিনি, ইরাকি ও অন্যান্য আরব বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস রয়েছে।

ফলে ফিলিস্তিনি-আমেরিকান বংশোদ্ভূত একজন রাজনীতিক হিসেবে তালিবের উপস্থিতি এই অঞ্চলের বহু বাসিন্দার কাছে প্রতিনিধিত্বের বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

তবে তাঁর নির্বাচনী সমর্থন শুধু আরব-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, শ্রমজীবী এবং বিভিন্ন অভিবাসী জনগোষ্ঠীর ভোটারও এ জেলার বাসিন্দা। ফলে তাঁর নির্বাচনী সাফল্যকে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সমর্থন দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।

গাজা যুদ্ধ ও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে রাশিদা তালিবের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক অবস্থানগুলোর একটি ফিলিস্তিন ইস্যু।

গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে তিনি ধারাবাহিকভাবে কথা বলেছেন। ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ, গাজায় যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হলে তিনি মার্কিন প্রশাসনের নীতির সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি—উভয় জনগোষ্ঠীর বেসামরিক মানুষের জীবন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং যুদ্ধবিরতি ছাড়া মানবিক বিপর্যয় আরও বাড়বে।

তবে তাঁর কিছু বক্তব্য ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কংগ্রেসে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ২৩৪-১৮৮ ভোটে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিন্দা বা ‘সেন্সার’ করে। তাঁর বিরুদ্ধে আনা প্রস্তাবে অভিযোগ করা হয়েছিল, তিনি ৭ অক্টোবরের হামলা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের ধ্বংসের আহ্বান জানিয়েছেন।

তালিব এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, তাঁর বক্তব্য বিকৃত করা হচ্ছে এবং ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলার কারণে তাঁকে নীরব করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে তিনি হামাস ও ইসরায়েলি সরকারের হাতে বেসামরিক মানুষের হত্যার নিন্দা এবং যুদ্ধবিরতি, জিম্মিদের মুক্তি ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে সমালোচনা

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে তালিবের সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

ইসরায়েলকে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ, গাজায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের জন্য দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি বিভিন্ন প্রস্তাব ও উদ্যোগে অংশ নিয়েছেন।

এ ছাড়া ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডে মার্কিন অর্থ ও অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে কংগ্রেসে জবাবদিহির দাবি জানিয়েছেন।

তাঁর এই অবস্থানের কারণে রিপাবলিকান রাজনীতিকদের পাশাপাশি ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যপন্থি অংশের সঙ্গেও বিভিন্ন সময়ে মতবিরোধ হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাঁর অবস্থানকে সমর্থন করা মানুষের পাশাপাশি বিরোধিতাকারী গোষ্ঠীও রয়েছে।

শুধু ফিলিস্তিন নয়, স্থানীয় অর্থনীতি নিয়েও সক্রিয়

রাশিদা তালিবের রাজনৈতিক কার্যক্রম কেবল পররাষ্ট্রনীতি বা ফিলিস্তিন ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়।

তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও আইন প্রণয়নের উদ্যোগে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শ্রমিক অধিকার, পরিবেশদূষণ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

ডেট্রয়েট অঞ্চলে শিল্পকারখানার দূষণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে পরিবেশগত ন্যায়বিচারের আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের আর্থিক সেবা এবং তদারকি ও জবাবদিহি-সংক্রান্ত কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এসব কমিটির মাধ্যমে আবাসন, ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা ও সরকারি কার্যক্রমের বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, গাড়ির বিমায় বৈষম্য বন্ধ এবং বড় কোম্পানিগুলোর মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে।

পঞ্চম মেয়াদের নির্বাচনে কী ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা?

এবারের নির্বাচনে তালিবের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন রিপাবলিকান প্রার্থী জেমস ডি হুপার। তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তালিবের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

হুপার নিজেকে রক্ষণশীল রিপাবলিকান হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর প্রচারণায় ব্যবসাবান্ধব নীতি, সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, গর্ভপাতবিরোধী অবস্থান এবং অস্ত্র রাখার সাংবিধানিক অধিকার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।

অন্যদিকে তালিব স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা, সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমিক অধিকার ও পরিবেশের পাশাপাশি ফিলিস্তিন ইস্যুতে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।

এবারের নির্বাচনে গ্রিন পার্টির ব্রেন্ডা স্যান্ডার্স, ইউএস ট্যাক্সপেয়ার্স পার্টির মার্ক জোসেফ সোসনোস্কি এবং ওয়ার্কিং ক্লাস পার্টির গ্যারি ওয়ালকোভিচও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

তবে তালিবের নির্বাচনী এলাকায় ডেমোক্র্যাটদের দীর্ঘদিনের শক্তিশালী অবস্থান এবং তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এর তাৎপর্য কী?

রাশিদা তালিবের পঞ্চম মেয়াদে জয় যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ফিলিস্তিনি-আমেরিকান প্রতিনিধিত্ব অব্যাহত রাখার পাশাপাশি দেশটির অভিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ ও ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিতর্ক চলার সময়ে তাঁর পুনর্নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে একটি নির্বাচনী এলাকার ফলাফল দিয়ে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের ফিলিস্তিন বা ইসরায়েলবিষয়ক মনোভাব নির্ধারণ করা যায় না। বরং এটি মিশিগানের ১২তম জেলার ভোটারদের স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যুতে দেওয়া রায়ের প্রতিফলন।

নতুন মেয়াদে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তালিব। তাঁর সামনে স্থানীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে কাজ করার পাশাপাশি ফিলিস্তিন, গাজা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে কংগ্রেসে নিজের অবস্থান অব্যাহত রাখার সুযোগ থাকবে।


Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।