যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম সমকামী পুরুষ নির্বাচিত, ইতিহাস গড়লেন ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাস
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিউ হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যের সিনেট আসনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ক্রিস পাপাস। এর মধ্য দিয়ে দেশটির ইতিহাসে প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ হিসেবে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হওয়ার নজির গড়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক সিনেটর জন সুনুনুকে পরাজিত করেন পাপাস।
বুধবার (৪ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত নির্বাচনী ফলাফলে তাঁর জয় নিশ্চিত হওয়ার খবর জানানো হয়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও রয়টার্সের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই জয়ের ফলে ডেমোক্রেটিক পার্টি নিউ হ্যাম্পশায়ারের আসনটি নিজেদের দখলে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
আগামী জানুয়ারিতে শপথ নেওয়ার পর ৪৬ বছর বয়সী পাপাস যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ইতিহাসে প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
কেন ঐতিহাসিক এই জয়?
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে যৌন অভিমুখিতা ও লিঙ্গপরিচয়ের ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে ক্রিস পাপাসের জয়কে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০১২ সালে উইসকনসিন থেকে নির্বাচিত হয়ে ট্যামি বাল্ডউইন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী ব্যক্তি হিসেবে ইতিহাস গড়েছিলেন। তিনি একজন নারী। এবার পাপাস প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ হিসেবে সিনেটে নির্বাচিত হলেন।
এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে প্রকাশ্যে সমকামী রাজনীতিকেরা দায়িত্ব পালন করলেও সিনেটে এই পরিচয়ের কোনো পুরুষ সদস্য নির্বাচিত হননি।
তবে নির্বাচনী প্রচারণায় নিজের যৌন পরিচয়কে প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরেননি পাপাস। এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ইতিহাস গড়ার জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না; বরং নিউ হ্যাম্পশায়ারের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করাই তাঁর লক্ষ্য।
এবারের নির্বাচনে তাঁর পরিচয়ের পাশাপাশি অর্থনীতি, জ্বালানির দাম, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
কে এই ক্রিস পাপাস?
১৯৮০ সালের ৪ জুন নিউ হ্যাম্পশায়ারের ম্যানচেস্টারে জন্মগ্রহণ করেন ক্রিস পাপাস। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরকার ও রাজনীতি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
রাজনীতিতে আসার আগে পরিবারের রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর পরিবারের রেস্তোরাঁটি ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
২০০৩ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু। পরে হিলসবোরো কাউন্টির কোষাধ্যক্ষ এবং অঙ্গরাজ্যের নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে জয়ী হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন পাপাস। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে নিউ হ্যাম্পশায়ারের প্রথম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী রাজনীতিকও তিনি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিউ হ্যাম্পশায়ারের নির্বাচন?
নিউ হ্যাম্পশায়ারের এই সিনেট আসনটি ছিল এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন।
দীর্ঘ ১৮ বছর সিনেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর জিন শাহিন। তাঁর ছেড়ে দেওয়া আসনটি নিজেদের দখলে নিতে রিপাবলিকানরা সাবেক সিনেটর জন সুনুনুকে প্রার্থী করে।
সুনুনু ২০০৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সিনেট সদস্য ছিলেন। তাঁর পরিবারও নিউ হ্যাম্পশায়ারের রাজনীতিতে সুপরিচিত। ফলে নির্বাচনে তাঁর শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান ছিল।
অন্যদিকে পাপাস ২০১৯ সাল থেকে প্রতিনিধি পরিষদে দায়িত্ব পালন করছেন। নিজেকে নিউ হ্যাম্পশায়ারের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া মধ্যপন্থি ডেমোক্র্যাট হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
নিউ হ্যাম্পশায়ারকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বা সুইং স্টেট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে এই আসনে জয় রিপাবলিকানদের জন্য সিনেটে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্য নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে
এবারের নির্বাচনে নিউ হ্যাম্পশায়ারের ভোটারদের কাছে জ্বালানির মূল্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছিল।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রল ও ঘর গরম রাখার জ্বালানি তেলের দামে।
নির্বাচনী প্রচারণায় পাপাস এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের নীতিকে দায়ী করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ইরান যুদ্ধের কারণে সাধারণ পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।
অন্যদিকে জন সুনুনু যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো হলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির দাম কমানো সম্ভব।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এই নির্বাচনে পাপাসের প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ এই জয়?
নিউ হ্যাম্পশায়ারের আসনটি ধরে রাখা ডেমোক্র্যাটদের জন্য বড় রাজনৈতিক সাফল্য। কারণ নির্বাচনের আগে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে থাকা স্বতন্ত্র সদস্যদের নিয়ে তাদের আসন ছিল ৪৭টি।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। ফলে নিউ হ্যাম্পশায়ারে জন সুনুনুর পরাজয় রিপাবলিকানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য জয় থেকে বঞ্চিত করেছে।
তবে পাপাসের জয় একাই সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পরিবর্তন করেনি। অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে সিনেটের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ।
পরিচয়ের চেয়ে প্রতিনিধিত্ব ও নীতিই ছিল প্রচারণার কেন্দ্রে
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্রিস পাপাসের জয় একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। তবে তাঁর নির্বাচনী সাফল্যকে শুধু যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করলে নির্বাচনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষিত হবে।
স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি ব্যয়, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে কেন্দ্র করে তাঁর প্রচারণা পরিচালিত হয়েছে। নিউ হ্যাম্পশায়ারের ভোটারদের কাছে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মানুষের প্রতিনিধিত্ব বাড়ার বিষয়টি দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আগামী জানুয়ারিতে শপথ নেওয়ার পর সিনেটের প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন ক্রিস পাপাস। তাঁর নির্বাচনী জয় একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাফল্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতির ইতিহাসে একটি নতুন সংযোজন।
