গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভে আহত তৌফিকের মৃত্যু, অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি
গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে হামলায় গুরুতর আহত শ্রমিক তৌফিক শেখ মারা গেছেন। আন্দোলন চলাকালে হামলার ঘটনা মুঠোফোনে ধারণ করার চেষ্টা করার সময় তিনি মারধরের শিকার হন বলে জানিয়েছেন তাঁর স্বজনেরা। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
তৌফিক গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ছয়ঘড়িয়া গ্রামের তবিবুর রহমান তবি খানের ছেলে। তিনি গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় বসবাস করতেন এবং স্থানীয় লায়লা গার্মেন্টসে কাজ করতেন। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি গাজীপুরে থেকে পোশাক কারখানায় কাজ করছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত সোমবার (২ নভেম্বর) গাজীপুরের জয়দেবপুর থানার অধীন বহাদুরপুর এলাকায় নোমান গ্রুপের টেরিটোরি গার্মেন্টসের সামনে। সেখানে শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে সংঘর্ষের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করতে গেলে তৌফিক হামলার শিকার হন বলে তাঁর স্বজনেরা জানিয়েছেন। পরে সহকর্মী শ্রমিকেরা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।
ঘটনা নিয়ে স্বজন ও পুলিশের বক্তব্যে ভিন্নতা
তৌফিকের স্বজনদের অভিযোগ, আন্দোলনের সময় একটি হামলার দৃশ্য ভিডিও করতে গেলে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর ওপর চড়াও হন। তাঁকে মারধর করে গুরুতর আহত করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
তবে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন ঘটনার ভিন্ন বিবরণ দিয়েছেন।
তাঁর ভাষ্য, একটি কারখানা বন্ধ করার জন্য বহিরাগত কিছু লোক সেখানে গিয়ে চাপ সৃষ্টি করে। কারখানা কর্তৃপক্ষ বন্ধ করতে রাজি না হওয়ায় বহিরাগতদের সঙ্গে কারখানার শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। এতে একজন শ্রমিক গুরুতর আহত হন এবং পরে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার সময় সেখানে পুলিশের কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না বলেও জানান তিনি।
তবে কারা তৌফিককে মারধর করেছে এবং সংঘর্ষের পেছনে কারা জড়িত, তা নিয়ে তদন্তের বিস্তারিত এখনো প্রকাশিত হয়নি।
অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা
তৌফিকের মৃত্যুর পাশাপাশি গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে অর্ধশতাধিক তৈরি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে বিভিন্ন কারখানা কর্তৃপক্ষ পৃথক নোটিশে ছুটির সিদ্ধান্ত জানায়।
গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকার কটন ক্লাব (বিডি) লিমিটেড ও কটন ক্লাউড (বিডি) লিমিটেড দুই দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠান দুটির নোটিশ অনুযায়ী, বুধবার ও বৃহস্পতিবার কারখানা বন্ধ থাকবে। তবে নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের কর্মীরা এ ছুটির আওতামুক্ত থাকবেন।
কালিয়াকৈরের পূর্ব চন্দ্রা এলাকার লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি এক দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। কারখানাটির নোটিশে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) থেকে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরুর কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ভোগড়া এলাকার প্যানোরোমা অ্যাপারেলস, কাশিমপুরের মিতালী ক্লাব ও জকি গার্মেন্টস তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। কোনাবাড়ীর জরুন এলাকার স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ, মনটেক্স ও ডিবিএল দুই দিনের ছুটি দিয়েছে।
কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার এপেক্স হোল্ডিং, ইকোটেক্স, কোকোলা ফুড প্রোডাক্ট, সাদমা ফ্যাশন ও ইন্টারস্টফসহ আরও কয়েকটি কারখানায়ও ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষগুলোর আশা, কয়েক দিনের ছুটিতে শিল্পাঞ্চলের উত্তেজনা কমবে এবং উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।
৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলন
গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের প্রধান দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করা। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে সর্বশেষ নির্ধারিত এই মজুরি কার্যকর হয়।
শ্রমিকদের অভিযোগ, বাড়িভাড়া, খাদ্যপণ্য, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরি দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে তাঁদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে। এ অবস্থায় নতুন করে মজুরি নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার শ্রমিকদের আন্দোলন চতুর্থ দিনে গড়ায়। গাজীপুর, আশুলিয়া ও রাজধানীর মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। সংঘর্ষে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যসহ কয়েক ডজন মানুষ আহত হন।
মজুরি বোর্ড গঠন করেও থামেনি অসন্তোষ
শ্রমিকদের দাবি পর্যালোচনা ও নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য গত ১ নভেম্বর সরকার ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। তবে বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন থামেনি।
৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। শ্রমিকদের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে, নতুন বোর্ডের সুপারিশে তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অপর্যাপ্ত মজুরি নির্ধারণ করা হতে পারে। এ কারণে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্তের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।
অন্যদিকে পোশাক কারখানার মালিকেরা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে বড় ধরনের মজুরি বৃদ্ধির অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
রপ্তানি ও কর্মসংস্থানেও বাড়ছে উদ্বেগ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে।
দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক অসন্তোষ ও কারখানা বন্ধ থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হতে পারে। বিশেষ করে বসন্ত ও গ্রীষ্ম মৌসুমের পোশাকের রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে সময়সূচি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রয়টার্সকে সুইডিশ পোশাক ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম জানিয়েছে, কয়েকটি কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও এখন পর্যন্ত তাদের সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি। তবে পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
এদিকে শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এবং শ্রমিকদের মজুরি-সংক্রান্ত দাবির সমাধান—দুই বিষয়ই এখন সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গাজীপুরে তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনায় কারা দায়ী, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। একই সঙ্গে মজুরি বোর্ডের সুপারিশ, শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত এবং কারখানাগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ফেরার বিষয়টিও এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
