ঢাকায় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতা লিউ হাইশিং, গুরুত্ব পাচ্ছে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক
বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার করতে তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং। সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক সংলাপ, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসার কথা রয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাত ১১টার দিকে এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। বিমানবন্দরে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা এবং সরকারি কর্মকর্তারা চীনা প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু করেন লিউ হাইশিং।
সকাল ১০টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এবং বেলা ১১টায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে তাঁর। রাষ্ট্রপতির আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে চীনা প্রতিনিধিদলের প্রধানের।
কেন গুরুত্বপূর্ণ লিউ হাইশিংয়ের এই সফর?
লিউ হাইশিং চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো সাধারণ কর্মকর্তা নন। তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান এবং দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির এই বিভাগটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দল ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং রাজনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের দায়িত্বও এ বিভাগের।
১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিভাগটি চীনের দলীয় কূটনীতির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে।
১৯৬৩ সালের এপ্রিলে জন্ম নেওয়া লিউ ১৯৮৫ সালে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। দীর্ঘ কূটনৈতিক জীবনে তিনি ইউরোপবিষয়ক মহাপরিচালক এবং সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমান দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের সাধারণ কার্যালয়ের নির্বাহী উপপরিচালক ছিলেন।
ফলে তাঁর এই সফরকে শুধু একটি প্রটোকলভিত্তিক কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জুনে তারেক রহমানের চীন সফরের পর নতুন সমীকরণ
লিউ হাইশিংয়ের ঢাকা সফরের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গত জুনের চীন সফর।
২২ থেকে ২৬ জুন চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী। সে সময় চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়।
সফর শেষে প্রকাশিত দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয় দুই দেশ। এ সময় ‘নিউ এরা’ বা নতুন যুগে বাংলাদেশ-চীন অভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অঙ্গীকারও করা হয়।
যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ সরকারের পাশাপাশি আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়। একই সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপের কাঠামো প্রতিষ্ঠা এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালুর সম্ভাবনা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়।
লিউ হাইশিংয়ের বর্তমান সফরকে ওই সমঝোতাগুলোর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক সংলাপ ও নতুন গবেষণা কেন্দ্রের উদ্বোধন
বুধবার দুপুর ২টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ক্রিস্টাল বলরুমে ‘হোয়্যার হিস্ট্রি ইলুমিনেটস দ্য ফিউচার: চায়না-বাংলাদেশ পলিটিক্যাল পার্টিজ প্লাস’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে লিউ হাইশিংয়ের।
একই অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশ-চীন সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজ’ নামে একটি গবেষণা ও অধ্যয়নকেন্দ্রের উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে।
কেন্দ্রটির নাম ও আয়োজিত সংলাপের বিষয়বস্তু থেকে বোঝা যায়, দুই দেশের রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং নীতিনির্ধারণসংক্রান্ত জ্ঞান বিনিময় এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। তবে কেন্দ্রটির কার্যক্রম, গবেষণার পরিধি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রশাসনিক কাঠামো ও দলীয় নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিনিময় করার জন্য এ ধরনের সংলাপ আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশের জন্যও প্রশাসনিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রগুলোর একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা। দেশের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ, শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে চীনা বিনিয়োগ এবং সহযোগিতা রয়েছে।
তবে দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বাংলাদেশ চীন থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করলেও দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলক কম।
গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বাংলাদেশের পণ্য, বিশেষ করে ফল, সামুদ্রিক খাদ্য, চামড়াজাত পণ্য ও ওষুধের বাজার সম্প্রসারণের বিষয়টি আলোচনায় আসে। পাশাপাশি চলমান অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনা, বন্দর উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নেও সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করে চীন।
লিউ হাইশিংয়ের সফরে এসব সমঝোতার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক পর্যায়ে সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। তবে তাঁর বর্তমান সফরে কোনো নতুন ঋণ, বিনিয়োগ বা প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণা এখনো পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে নৈশভোজ
প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখবেন লিউ হাইশিং।
সন্ধ্যা ৭টায় রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
এর আগে বিকেল পৌনে ৪টা থেকে সোয়া ৪টা পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শন করবেন চীনা প্রতিনিধিদলের প্রধান। এরপর ঢাকায় চীনের সাবেক দূতাবাস চ্যান্সারি ভবনের স্থান এবং বর্তমান চ্যান্সারিও পরিদর্শন করবেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল পৌনে ৯টায় শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজে একটি জীবিকাসহায়তা প্রদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। এরপর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ওই দিন দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে তাঁর ঢাকা ত্যাগের কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা দেশটিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
চীনের কাছে বাংলাদেশ অবকাঠামো, বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য চীন বড় আমদানি উৎস, উন্নয়ন সহযোগী এবং বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়ন ও প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
তবে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। ফলে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাণিজ্যিক স্বার্থ, ঋণের শর্ত, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
লিউ হাইশিংয়ের এই সফরে এখন পর্যন্ত কোনো বড় অর্থনৈতিক চুক্তি বা নতুন সামরিক সমঝোতার ঘোষণা আসেনি। তবে জুনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিন দিনের এ সফরের আনুষ্ঠানিক বৈঠক, রাজনৈতিক সংলাপ এবং নতুন গবেষণাকেন্দ্রের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ের সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
