বিশ্বঋণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াল, শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র; বাংলাদেশ ৪৫তম
বিশ্বের মোট ঋণের পরিমাণ ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়ে জুনের শেষে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। সরকারি ঋণ, পরিবার ও আর্থিক-অনাফারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ মিলিয়ে এই রেকর্ড পরিমাণ দায় তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি ঋণের পরিমাণের হিসাবে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম।
ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) সর্বশেষ গ্লোবাল ডেট মনিটর প্রতিবেদনে বৈশ্বিক ঋণের এই চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ঋণ বৃদ্ধিও বৈশ্বিক মোট ঋণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সরকারি ঋণে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারি ঋণের পরিমাণে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সবার ওপরে। দেশটির সরকারি ঋণ প্রায় ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১২৭ শতাংশ।
তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। দেশটির সরকারি ঋণ প্রায় ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ। প্রায় ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার সরকারি ঋণ নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে জাপান। দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১৯৯ শতাংশ।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণ প্রায় ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ফ্রান্সের ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। তালিকায় দেশ দুটির অবস্থান যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম। অন্যদিকে ভারতের সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটিকে তালিকার সপ্তম স্থানে রেখেছে।
বাংলাদেশের ঋণ প্রায় পাঁচ গুণ
বৈশ্বিক সরকারি ঋণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ।
২০১০ সালে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ গত দেড় দশকে ঋণের পরিমাণ প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। তবে ঋণ-জিডিপি অনুপাতের হিসাবে বাংলাদেশ এখনো অনেক উন্নত অর্থনীতির দেশের তুলনায় নিচের অবস্থানে রয়েছে।
ঋণের সুদ বাড়লে চাপে পড়ে জনসেবা
সরকারগুলো সাধারণত বন্ড বিক্রি করে অর্থ ধার নেয়। বিনিয়োগকারীরা এসব বন্ড কিনে সরকারকে অর্থ দেন এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সুদ ও মূলধন ফেরত পান। তবে ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি সুদের হার বৃদ্ধি পেলে সরকারের ঋণ পরিচালনার ব্যয়ও বেড়ে যায়।
এর প্রভাব পড়ে সরকারি বাজেটে। ঋণের সুদ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে বরাদ্দের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে কর বাড়ানো, ব্যয় কমানো কিংবা নতুন করে ঋণ নেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব দেশের বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃঅর্থায়ন করতে হয়, সেখানে সুদের হার বেড়ে গেলে আর্থিক চাপ দ্রুত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়া অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ঋণ নেওয়া নিজেই অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রমাণ নয়। অবকাঠামো উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হলে ঋণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। মূল চ্যালেঞ্জ হলো ঋণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বজায় রাখা।
বৈশ্বিক ঋণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তাই শুধু ঋণের পরিমাণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে না; বরং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, সুদের ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন সামনে আনছে।
