ডিআইজির ভাড়া বাড়িতে মাদক পার্টি: আটক ৮৫, করপোরেট কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ঘিরে রহস্য
রাজধানীর পূর্বাচলসংলগ্ন পুলিশ অফিসার্স হাউজিংয়ের একটি বাড়িতে মাদকবিরোধী অভিযানে বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ আটকের পর তাঁদের পরিচয় ও সেখানে জড়ো হওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাড়িটির মালিক পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) আবদুল্লাহ আল জহির। গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পাশাপাশি সেখানে নিয়মিত ডিজে পার্টি আয়োজনের তথ্য সামনে এসেছে। তবে আটক ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয়, পেশা এবং তাঁদের সেখানে জড়ো হওয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সোমবার রাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তরা বিভাগের একটি দল পুলিশ অফিসার্স হাউজিংয়ের ওই বাড়িতে অভিযান চালায়। অভিযানে নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ৮৫ জনকে আটক করা হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আটকের সংখ্যা ৮৪ থেকে ৮৫ জনের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিবির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িটিতে মাদক সেবন এবং অনুমোদনহীন ডিজে পার্টি আয়োজনের অভিযোগে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে ইয়াবা, গাঁজা, মদ, শিসা এবং মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ২৬ জন নারী ছিলেন।
এক রাতে নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলছিল আয়োজনের অভিযোগ
ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িটিতে নিয়মিত ডিজে পার্টি আয়োজন করা হতো। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অতিথিদের নিবন্ধন ও বাড়ি ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, সেখানে প্রতি মাসে প্রায় ২০ থেকে ২২টি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।
বাড়িটি আবাসিক হোটেল বা রিসোর্ট হিসেবে অনুমোদিত ছিল না এবং সেখানে বার বা রেস্টুরেন্ট পরিচালনার লাইসেন্সও ছিল না বলে বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বাড়িটিতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে প্রকাশিত অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে প্রায়ই গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চ শব্দে গান-বাজনা চলত। এ নিয়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল।
আটক ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি
আটক ব্যক্তিদের পেশা ও পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষার্থী, ব্যাংক কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। দৈনিক আমার দেশ-এর বিশেষ প্রতিবেদনেও একাধিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সেখানে উপস্থিত থাকার দাবি করা হয়েছে।
তবে ডিবির প্রধান শফিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিদের পেশা কিংবা তাঁরা কী উদ্দেশ্যে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন, সে বিষয়ে তদন্তকারী সংস্থা নিশ্চিত তথ্য পায়নি। তাঁদের সবার পূর্ণাঙ্গ পরিচয়ও প্রকাশ করা হয়নি।
ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের উপস্থিতির দাবি এবং তাঁদের সমাবেশের প্রকৃত উদ্দেশ্য—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। কারও পেশাগত পরিচয় কোনো অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ নয়। একইভাবে, সেখানে কোনো বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা ছিল কি না, তা নিশ্চিত করার মতো তথ্যও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
মোবাইল কোর্টে সাজা, প্রশ্নের মুখে বাড়ির ব্যবস্থাপনা
অভিযানের পর আটক ব্যক্তিদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পুরুষদের এক মাস এবং নারীদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে জরিমানার পরিমাণ নিয়ে সংবাদপ্রতিবেদনগুলোতে কিছুটা অমিল রয়েছে।
এদিকে বাড়িটির মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির দাবি করেছেন, জন্মদিন বা পারিবারিক অনুষ্ঠানের কথা বলে বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়িটি পরিচালনার দায়িত্বে একজন ব্যবস্থাপক ছিলেন। সেখানে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড হয়ে থাকলে তিনি তার দায় এড়াতে পারেন না বলেও মন্তব্য করেছেন।
ঘটনার পর আবদুল্লাহ আল জহিরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত এবং বাড়ি নির্মাণ ও জমি কেনার অর্থের উৎস অনুসন্ধানের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কী ধরনের চূড়ান্ত বিভাগীয় বা ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তদন্তে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি
এ ঘটনায় কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আবাসিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে এমন আয়োজন চললে স্থানীয় নজরদারি ব্যবস্থা কেন কার্যকর হয়নি। দ্বিতীয়ত, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাড়িটি ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিথিদের পরিচয় ও অনুষ্ঠানের প্রকৃতি যাচাই করা হয়েছিল কি না। তৃতীয়ত, মাদকদ্রব্যের উৎস এবং আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল।
আটক ব্যক্তিদের পরিচয়, বাড়িটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং উদ্ধার করা মাদকদ্রব্যের উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে তাঁকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করাও গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশ কর্মকর্তার মালিকানাধীন একটি বাড়িতে এমন ঘটনার অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং আবাসিক এলাকায় অনলাইনভিত্তিক ভাড়া কার্যক্রমের তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তদন্তের ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে।
