সাজেকে সেনা ও পর্যটকবহরে সন্ত্রাসী হামলা, ৩০–৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়ার অভিযোগ ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে

৬ মিনিটে পড়ুন৫ বার পড়া হয়েছে

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার উজোবাজার এলাকায় অবরোধের কারণে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) দাবি, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়েন। জবাবে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায় সেনাবাহিনী। তবে ইউপিডিএফ গোলাগুলির ঘটনা অস্বীকার করেছে। সংঘর্ষে নিরাপত্তাকর্মীদের হতাহতের সংখ্যা নিয়েও পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছিল। এতে পর্যটনকেন্দ্রটিতে অবস্থানরত প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েন। পরিস্থিতি বিবেচনায় তাঁদের খাগড়াছড়ির দিকে নিরাপদে ফিরিয়ে নিতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথ নিরাপত্তা বহর নিয়ে অভিযান শুরু করে।

যেভাবে শুরু হয় সংঘর্ষ

পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার দিকে পর্যটকদের নিয়ে নিরাপত্তা বহর সাজেক থেকে রওনা হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বহরটি উজোবাজার এলাকায় পৌঁছালে অবরোধকারীরা সড়ক আটকে দেন। এর আগে সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছের গুঁড়ি ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা ফেলে যান চলাচল বন্ধ করা হয়েছিল। কয়েকটি স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভও করেন অবরোধকারীরা।

পর্যটকদের নিরাপদে যেতে দেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। কিন্তু সমঝোতা না হওয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আইএসপিআরের বিবৃতি অনুযায়ী, সকাল পৌনে ১১টার দিকে অবরোধকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরে নিরাপত্তা বাহিনী লাঠিচার্জ করে সড়কের প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে।

এরপর সকাল ১১টার দিকে গুলিবিনিময় শুরু হয় বলে আইএসপিআর জানিয়েছে। সংস্থাটির দাবি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে সেনাবাহিনীর একটি টহল দল আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যান।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিবও সংবাদ সম্মেলনে গুলিবিনিময়ের কথা জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থেমে থেমে প্রায় দুই ঘণ্টা গোলাগুলি চলে।

তবে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা এক বিবৃতিতে গোলাগুলির খবর প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দাবি, স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গুলিবিনিময়ের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁর অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ অবরোধ ভাঙতে নিরাপত্তাকর্মীরা বিভিন্ন দিকে গুলি ছুড়েছেন।

কেন অবরোধ, কী দাবি আন্দোলনকারীদের?

সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি যৌথভাবে অবরোধের ডাক দেয়। সংগঠন দুটির অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা পক্ষের সশস্ত্র সদস্যরা সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, এসব সশস্ত্র সদস্যকে এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে হবে এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

সংগঠন দুটির দাবি অনুযায়ী, মাচালং, থলকুম্ভ, ছল্যতুলি কুটির, নয়াপাড়া, লাম্বাবাক ও ভুইয়োছড়িসহ কয়েকটি এলাকায় সশস্ত্র তৎপরতার কারণে সাধারণ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, শতাধিক বাসিন্দা বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক জুমচাষি নিজেদের জমিতে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছেন না।

তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে জেএসএস। সংগঠনটির সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা অভিযোগগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন সংগঠনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।

উল্লেখ্য, আন্দোলনকারীদের অবরোধসংক্রান্ত অভিযোগে জেএসএসের সন্তু লারমা পক্ষের নাম এসেছে। অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার গুলিবিনিময়ের ঘটনায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দায়ী করেছে আইএসপিআর। সংগঠন দুটি পৃথক হওয়ায় তাদের পরিচয় ও ভূমিকা এক করে দেখা ঠিক হবে না।

প্রায় তিন হাজার পর্যটক নিরাপদে সরানো, সাজেকে ভ্রমণ বন্ধ

সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট ২ হাজার ৯৩৩ জন পর্যটককে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁরা খাগড়াছড়ির দিকে পৌঁছেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীর স্বাক্ষরিত জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার মধ্যে সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

বৃহস্পতিবার দুপুরের পর উজোবাজার এলাকায় পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রশাসনের পরবর্তী নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ।

পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জীবিকার প্রশ্ন

সাজেকের অবরোধ ও সংঘর্ষ কেবল পর্যটকদের নিরাপত্তাকেই প্রভাবিত করছে না; স্থানীয় মানুষের চলাচল, পণ্য পরিবহন এবং জীবিকার ওপরও প্রভাব ফেলছে। সড়ক বন্ধ থাকলে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ এবং পর্যটননির্ভর ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

একই সঙ্গে গুলিবিনিময়ের অভিযোগ এবং বিভিন্ন পক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, নিরাপত্তাকর্মী ও সাধারণ মানুষের আহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ।

সাজেকের পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ, স্থানীয় সংগঠনগুলোর সঙ্গে সংলাপ এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও চলাচল পুনরুদ্ধার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।