বাণিজ্য ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য তুরস্ক-কানাডার, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা জোরদার
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশলগত অংশীদারত্ব ঘোষণা করেছে তুরস্ক ও কানাডা। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি এবং পরিবহন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে ন্যাটোর দুই সদস্যদেশ। বৃহস্পতিবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বৈঠকের পর এসব উদ্যোগের কথা জানানো হয়।
এরদোয়ান বলেছেন, বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। এটিকে প্রথম পর্যায়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে এবং পরবর্তী সময়ে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চায় আঙ্কারা ও অটোয়া। এ লক্ষ্য অর্জনে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন যৌথ প্রকল্প গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কার্নির এই সফর কানাডার কোনো প্রধানমন্ত্রীর তুরস্কে প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর। এর আগে জুলাইয়ে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় দুই নেতা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এবার সেই উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে কৌশলগত অংশীদারত্বের পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু আগামী মাসে
বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কানাডা-তুরস্ক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে প্রথম দফার আলোচনা আগামী নভেম্বর মাসে আঙ্কারায় শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছেন কার্নি। চুক্তিটি সম্পন্ন হলে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের চুক্তির মাধ্যমে পণ্য ও সেবার বাণিজ্য সহজ করা, বিনিয়োগের বাধা কমানো এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। তবে আলোচনার বিষয়বস্তু, শুল্কসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং চুক্তির চূড়ান্ত শর্ত নির্ধারণে দুই দেশের আলোচকদের আরও কাজ করতে হবে।
বৃহস্পতিবার দুই দেশ সম্প্রসারিত বিমান পরিবহন চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেছে। এর উদ্দেশ্য দুই দেশের মধ্যে বিমান যোগাযোগ বাড়ানো, পর্যটন ও বাণিজ্য সহজ করা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ সম্প্রসারণ করা।
এ ছাড়া কানাডার এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট কানাডা এবং তুরস্কের এক্সিমব্যাংকের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তৃতীয় দেশের বাজারে যৌথ বাণিজ্যিক প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনা
নতুন অংশীদারত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা। দুই দেশের নেতারা প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি, শিল্পোৎপাদন এবং যৌথ বাণিজ্যিক উদ্যোগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
তুরস্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক প্রযুক্তির উৎপাদন সম্প্রসারণ করেছে। অন্যদিকে, কানাডার রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি, মহাকাশ ও বিমানশিল্প এবং জ্বালানি খাতে বিশেষায়িত সক্ষমতা। দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়লে এসব খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি এবং নতুন জ্বালানি প্রযুক্তিতে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তুরস্কের নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে কানাডার প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ আহরণ, বিমান ও মহাকাশ প্রযুক্তি এবং উন্নত শিল্পপ্রযুক্তিকে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য আগামী তিন বছরের একটি কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন কার্নি। এর মাধ্যমে কৌশলগত অংশীদারত্বকে শুধু রাজনৈতিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমানোর কৌশল কানাডার
কানাডার সঙ্গে তুরস্কের এই সমঝোতা এমন এক সময়ে হলো, যখন অটোয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশীদার বৈচিত্র্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক ও বাণিজ্যনীতি নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে কানাডা নতুন বাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার খুঁজছে।
কানাডার মোট পণ্য রপ্তানির বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারনির্ভর। ফলে বিকল্প বাজার সম্প্রসারণ এবং ইউরোপ, এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা দেশটির বাণিজ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, তুরস্কও প্রতিরক্ষা শিল্প, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ এবং শিল্পপ্রযুক্তিতে নতুন বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের পরিপূরক হতে পারে।
তবে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা থাকলেও দুই দেশের সম্পর্ক অতীতে সব সময় মসৃণ ছিল না। মানবাধিকার পরিস্থিতি ও অস্ত্র রপ্তানিসংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে আগে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। নতুন অংশীদারত্ব সেই সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঘোষণা থেকে বাস্তবায়নই হবে বড় পরীক্ষা
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলেও তা অর্জনের জন্য সময়সীমা ও কার্যকর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হবে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা, বিনিয়োগের সুযোগ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ এবং পরিবহন যোগাযোগের উন্নয়ন এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
দুই দেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, জ্বালানি এবং প্রযুক্তিতে সহযোগিতার যে রূপরেখা দিয়েছে, তার বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে পরবর্তী আলোচনায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর ওপর।
নতুন কৌশলগত অংশীদারত্ব তাই শুধু দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়ন নয়; পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরিরও একটি উদ্যোগ। তবে ঘোষিত লক্ষ্য কতটা অর্জিত হবে, তা নির্ধারিত হবে চুক্তি, বিনিয়োগ এবং বাস্তব প্রকল্পের অগ্রগতির মাধ্যমে।
