স্কুলের ডিজিটাল রূপান্তরে ২১,৯০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা, তৈরি হবে এআই ও রোবোটিকস ল্যাব

৫ মিনিটে পড়ুন৬ বার পড়া হয়েছে

দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে প্রায় ২১ হাজার ৯০০ কোটি টাকার দুটি বড় প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর আওতায় ১০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক লাখ শ্রেণিকক্ষে বসানো হবে ইন্টার‌্যাকটিভ ডিজিটাল প্যানেল। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিকস ও থ্রিডি প্রিন্টিং শেখার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে অতীতের ডিজিটাল শিক্ষা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থাকায় নতুন উদ্যোগের কার্যকারিতা ও অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন শিক্ষাবিদেরা।

দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের ২০ হাজার ৭৬৭টি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় অর্ধেক এই উদ্যোগের আওতায় আসবে। তবে প্রকল্প দুটি এখনো প্রস্তাব ও অনুমোদনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।

দুটি প্রকল্পে ব্যয় প্রায় ২১,৯০০ কোটি টাকা

পরিকল্পনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে ‘মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্মার্ট লার্নিং পরিবেশ প্রতিষ্ঠা’ প্রকল্প। এর প্রস্তাবিত ব্যয় ১৮ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে ‘নেক্সটজেন সেকেন্ডারি এডুকেশন প্রোগ্রাম’-এর জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা।

প্রথম প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক লাখ শ্রেণিকক্ষে ইন্টার‌্যাকটিভ ডিজিটাল প্যানেল স্থাপন, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল পরিচয় নম্বর ও স্মার্ট কার্ড প্রদান এবং অনলাইন শিক্ষামঞ্চ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ মেগাবিট গতির ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের ট্যাবলেট কম্পিউটার ও প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদানের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

দ্বিতীয় প্রকল্পে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষ সম্প্রসারণ, বিজ্ঞানাগার আধুনিকায়ন এবং ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১ হাজার বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ৩ হাজার শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ১ হাজার ৫০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২ হাজার ১০০টি তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ল্যাবে রোবোটিকস, থ্রিডি প্রিন্টিং, মেশিন লার্নিং ও উন্নত কম্পিউটিং শেখার সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে।

দ্বিতীয় প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবিত অবদান ৫৬৬ কোটি ৯ লাখ টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দেবে প্রায় ২ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। এ ছাড়া গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশনের সহায়তা পাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে উদ্বেগ

বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পরিকল্পনা সামনে এলেও শিক্ষার মান উন্নয়নে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদেরা। তাঁদের মতে, শ্রেণিকক্ষে কম্পিউটার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্যানেল স্থাপন করলেই শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত হয় না। যন্ত্রপাতির ব্যবহার, শিক্ষকদের দক্ষতা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি মূল্যায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আগের প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতাও এই উদ্বেগের কারণ। একটি সরকারি মূল্যায়নে দেখা গিয়েছিল, ২০১৫ সালে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা যন্ত্রপাতির মধ্যে কিছু ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। অনেক শিক্ষক জানিয়েছিলেন, মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট তৈরির প্রশিক্ষণ তাঁদের যথেষ্ট প্রস্তুত করতে পারেনি। অন্যদিকে, ডিজিটাল ল্যাব প্রকল্পেও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি ও অকেজো সরঞ্জামের সমস্যা উঠে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এম নাজ আসাদুল্লাহ নতুন প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের আগে শিক্ষার মান উন্নয়নে এর সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

শহর-গ্রামের বৈষম্যও বড় চ্যালেঞ্জ

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসারে ইন্টারনেট ও কম্পিউটারের অসম প্রাপ্যতাও বাধা হয়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট জরিপের তথ্য অনুযায়ী, শহরের প্রায় ৬৫ শতাংশ পরিবারের বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে, যেখানে গ্রামে এই হার ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ। কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ব্যবধান বড়: শহরের ২১ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের কম্পিউটার থাকলেও গ্রামে এ হার মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

এই ব্যবধান দূর করতে হলে শুধু যন্ত্রপাতি সরবরাহ নয়, বিদ্যুৎ, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও নিয়মিত কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রস্তাবিত প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে দেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিসর বাড়তে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এই বিনিয়োগের সাফল্য নির্ভর করবে প্রকল্পের স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফলে বাস্তব উন্নতি ঘটানোর ওপর।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।