ইরান নিয়ে নতুন আলোচনায় ভ্যান্স, যুদ্ধের পক্ষে অনড় হেগসেথ; বুশেহরে আয়োডিন বিতরণ

৮ মিনিটে পড়ুন০ বার পড়া হয়েছে

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ বাড়ছে। একদিকে যুদ্ধ বন্ধ করে নতুন যুদ্ধবিরতি ও পারমাণবিক আলোচনায় ফেরার চেষ্টা করছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামরিক অভিযানকে ‘সাহসী ও ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে এর পক্ষে অবস্থান বজায় রেখেছেন। সম্প্রতি মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর এই মতপার্থক্য আরও প্রকাশ্য হয়েছে। একই সময়ে সম্ভাব্য তেজস্ক্রিয় ঝুঁকি মোকাবিলায় ইরানের বুশেহর শহরে বাসিন্দাদের মধ্যে আয়োডিন ট্যাবলেট বিতরণ অব্যাহত রেখেছে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

যুদ্ধ বন্ধে ভ্যান্সের কূটনৈতিক উদ্যোগ

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে ইরানের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা এগিয়ে নিতে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করছেন জেডি ভ্যান্স। এ উদ্যোগে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত রয়েছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। তাঁদের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন যোগাযোগ করছেন ভ্যান্স।

আলোচনায় যুক্ত রয়েছেন হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাইয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন ভ্যান্স। এতে সরাসরি আলোচনা পুনরায় শুরু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চিঠিটি নতুন করে আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

মধ্যস্থতাকারীরা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দুই দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের সম্ভাবনাও আলোচনা করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অগ্রগতি হলেও আলোচনা খুব ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

শুক্রবার কাতারের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে কাজ চলছে। তাঁর মতে, কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। একই দিনে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। আলোচনায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দূরত্ব কমাতে কাতারের উদ্যোগের বিষয়টি উঠে আসে।

নির্বাচনে পরাজয়ের পর যুদ্ধ নিয়ে চাপ

যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী দুই বছরের আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

নির্বাচনের পর ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স প্রকাশ্যে ইরান যুদ্ধকে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই যুদ্ধের বিনিময়ে দলটির কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানো আদৌ কতটা যৌক্তিক ছিল।

অন্যদিকে ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন, দীর্ঘদিনের সংঘাত এবং এর কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে তিনি সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের নির্বাচনী বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, ইরান যুদ্ধ এবং সরকারি দুর্নীতি নিয়ে অসন্তোষ ভোটারদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে। ফলে নির্বাচনের ফলকে শুধু একটি ইস্যুর প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

অভিশংসনের উদ্যোগের মুখে প্রতিরক্ষামন্ত্রী

রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও ইরান যুদ্ধের পক্ষে অনড় অবস্থান নিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেসে অভিশংসনের উদ্যোগ মোকাবিলার ঘোষণা দেন।

হেগসেথ বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান একটি ‘সাহসী ও ঐতিহাসিক’ পদক্ষেপ, যা দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখবে। তিনি দাবি করেন, তাঁর নেতৃত্বে পেন্টাগনে নেওয়া পরিবর্তনগুলো কার্যকর হয়েছে বলেই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে।

তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনার অন্যতম কারণ ইরান যুদ্ধ পরিচালনা, জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের বরখাস্ত এবং কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। ডেমোক্র্যাটরা আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে তদন্তের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

এদিকে রিপাবলিকান প্রতিনিধি টমাস ম্যাসি হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব পুনরায় উত্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও ট্রাম্প প্রকাশ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, তাঁর প্রশাসনে হেগসেথের ভবিষ্যৎ নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় বুশেহরে আয়োডিন বিতরণ

ওয়াশিংটনে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বুশেহর শহরে সম্ভাব্য পারমাণবিক বা তেজস্ক্রিয় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে।

ইরানের ইয়ং জার্নালিস্টস ক্লাবের (ওয়াইজেসি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুশেহর ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেসের স্বাস্থ্যবিষয়ক উপপ্রধান জানিয়েছেন, শহরটির বাসিন্দাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজার আয়োডিন ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। কর্মসূচির শুরুতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও পরে পুরো শহরের বাসিন্দাদের আওতায় আনা হয়।

কর্মসূচিটি ২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের আগেই শুরু হয়েছিল। বর্তমানে শহরের বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বাসিন্দাদের জন্য ট্যাবলেট সরবরাহ রাখা হয়েছে।

বুশেহর ইরানের উপসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত। দেশটির একমাত্র বর্তমানে চালু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও এই শহরে। ফলে সম্ভাব্য তেজস্ক্রিয় দুর্ঘটনা বা হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

আয়োডিন ট্যাবলেট মূলত তেজস্ক্রিয় আয়োডিনের শোষণ থেকে মানবদেহের থাইরয়েড গ্রন্থিকে সুরক্ষা দিতে ব্যবহৃত হয়। তবে এটি সব ধরনের তেজস্ক্রিয় পদার্থ কিংবা বাহ্যিক বিকিরণ থেকে সুরক্ষা দেয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।

কূটনীতি ও সামরিক প্রস্তুতি পাশাপাশি

যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যেই সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ১ নভেম্বর ট্রাম্প ইরানের অবশিষ্ট সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তুতে ১০ মিনিটের মধ্যে হামলা চালানোর সক্ষমতার কথা বলেছিলেন। তিনি বিশেষভাবে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামের একটি সন্দেহভাজন ভূগর্ভস্থ স্থাপনার উল্লেখ করেন।

এ ছাড়া শুক্রবার হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে একটি বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থায় মার্কিন বাহিনীর হামলার কথা নিশ্চিত করেছেন ট্রাম্প। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যবস্থা একটি মার্কিন যুদ্ধবিমানের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।

ফলে একদিকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি ও পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরুর চেষ্টা, অন্যদিকে সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রস্তুতি—দুটি পথই এখন ওয়াশিংটনের নীতিতে পাশাপাশি রয়েছে।

দীর্ঘ আট মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, ইরানের পাল্টা অবস্থান এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যস্থতা শেষ পর্যন্ত নতুন কোনো সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। এখন পর্যন্ত কোনো নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি বা সরাসরি বৈঠকের তারিখ চূড়ান্ত হয়নি।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।