রাশিয়ায় জাপান টোব্যাকোর সাত প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ, টোকিওর প্রতিবাদ
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে রাশিয়ার চলমান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সংঘাত এবার নতুন করে জাপানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। দেশটিতে কার্যক্রম পরিচালনাকারী জাপানের বৃহৎ তামাক কোম্পানি জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনালের (জেটিআই) সাতটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও সম্পদের ব্যবস্থাপনা রুশ কোম্পানির হাতে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এর ফলে রাশিয়ায় কোম্পানিটির ব্যবসার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ হারানোর মুখে পড়েছে জাপানি প্রতিষ্ঠানটি। মস্কোর এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে টোকিও।
গত ৫ নভেম্বর পুতিনের স্বাক্ষরিত প্রথম ডিক্রিতে জেটিআইয়ের রাশিয়াভিত্তিক চারটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও অংশীদারি রুশ প্রতিষ্ঠান ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাসেটস’-এর অস্থায়ী ব্যবস্থাপনায় দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো জেটিআই ডনস্কয় তাবাক, পেত্রো, জেটিআই ইয়েলেতস ও ক্রেস নেভা।
এর দুই দিন পর, ৭ নভেম্বর প্রকাশিত আরেকটি ডিক্রিতে আরও তিনটি প্রতিষ্ঠানকে একই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হয়। এগুলো হলো জেটিআই রাশিয়া, পেরেস্লাভল তাবাক এবং জেটিআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনোভেটিভ প্রোডাক্টস। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ায় জেটিআইয়ের আমদানি, ব্যবস্থাপনা ও হোল্ডিং কার্যক্রম পরিচালিত হতো। ফলে শুধু উৎপাদনকেন্দ্র নয়, কোম্পানিটির ব্যবসায়িক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশও এখন রুশ ব্যবস্থাপনার আওতায় চলে গেছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ জেটিআইয়ের রাশিয়ার ব্যবসা
জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তামাক উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান। জাপানভিত্তিক জাপান টোব্যাকো ইনকরপোরেটেডের আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক শাখা এটি। উইনস্টন, ক্যামেল, এলডি ও সোব্রানির মতো পরিচিত ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানটির পণ্যতালিকায় রয়েছে।
১৯৯৯ সাল থেকে রাশিয়ায় ব্যবসা করছে জেটিআই। ২০০৭ সাল থেকে দেশটির তামাক বাজারে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৮ সালে রাশিয়ার অন্যতম বড় তামাক উৎপাদনকারী কোম্পানি ডনস্কয় তাবাক অধিগ্রহণের মাধ্যমে বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে তারা।
রাশিয়ায় জেটিআইয়ের চারটি উৎপাদনকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে সেন্ট পিটার্সবার্গের পেত্রো এবং রোস্তভ-না-দনুর ডনস্কয় তাবাক সিগারেট উৎপাদন করে। অন্যদিকে লিপেৎস্ক অঞ্চলের জেটিআই ইয়েলেতস ও লেনিনগ্রাদ অঞ্চলের ক্রেস নেভা তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।
কোম্পানিটির হিসাবে, রাশিয়ায় তাদের কার্যালয় ও কারখানাগুলোতে প্রায় চার হাজার কর্মী কাজ করেন। জাপান টোব্যাকো গ্রুপের মোট রাজস্বের প্রায় ১০ শতাংশ আসে রাশিয়ার ব্যবসা থেকে। তবে পরিচালন মুনাফার ক্ষেত্রে দেশটির অবদান আরও বেশি, প্রায় ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ রাশিয়ার বাজারে নিয়ন্ত্রণ হারানো শুধু ব্যবসায়িক উপস্থিতির সংকট নয়, মূল কোম্পানির মুনাফার ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে নিষেধাজ্ঞার পাল্টা ব্যবস্থা
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। এর পর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ মস্কোর ওপর আর্থিক, বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। রাশিয়ার ব্যাংক, জ্বালানি খাত এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পদের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
এর প্রতিক্রিয়ায় ২০২৩ সালের ২৫ এপ্রিল ৩০২ নম্বর প্রেসিডেনশিয়াল ডিক্রি জারি করেন পুতিন। এর মাধ্যমে রাশিয়ার স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া বা রুশ সম্পদের মালিকানা ও অধিকার ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট বিদেশি দেশের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের রাশিয়ায় থাকা সম্পদ অস্থায়ী ব্যবস্থাপনায় নেওয়ার আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়।
এ ব্যবস্থার আওতায় অস্থায়ী ব্যবস্থাপক সম্পদের মালিকের মতো বিভিন্ন ব্যবস্থাপনাগত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। তবে সম্পদ হস্তান্তর বা বিক্রির ক্ষমতা তাঁর নেই। এ ব্যবস্থাপনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের হাতে রাখা হয়েছে।
ফলে জেটিআইয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি এখনই চূড়ান্ত জাতীয়করণ বা মালিকানা বিক্রি নয়। কোম্পানিটির মালিকানার কাঠামো বহাল থাকলেও রাশিয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তার কার্যকর ব্যবস্থাপনাগত নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। অস্থায়ী ব্যবস্থাপনা কত দিন চলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
জাপান সরকারেরও মালিকানা রয়েছে জাপান টোব্যাকোতে
ঘটনাটির বিশেষ কূটনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে জাপান সরকারের সঙ্গে জাপান টোব্যাকোর মালিকানা সম্পর্কের কারণে। কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়। তাদের হাতে প্রতিষ্ঠানটির ৩৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। জাপানের আইন অনুযায়ী, কোম্পানিটির ইস্যু করা শেয়ারের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সরকারের মালিকানায় থাকতে হয়।
রাশিয়ার এই সিদ্ধান্তের পর জাপান সরকার কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে। দেশটির মুখ্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা জানিয়েছেন, জাপানি নাগরিক ও কোম্পানির বৈধ স্বার্থ রক্ষায় মস্কোকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাতায়ামা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও জাপান টোব্যাকোর সঙ্গে সমন্বয় করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। দেশটির অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী রিওসেই আকাজাওয়াও রাশিয়ায় জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ সুরক্ষায় মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন।
অন্যদিকে জেটিআই জানিয়েছে, তারা রুশ সিদ্ধান্তের প্রভাব পর্যালোচনা করছে এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কর্মীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির পেছনে আরও যেসব কারণ
জাপান ও রাশিয়ার মধ্যে উত্তেজনার শিকড় শুধু ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন জাপানের নিয়ন্ত্রণাধীন কুরিল দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয়। দ্বীপগুলোর দক্ষিণাংশ, যা জাপানে নর্দার্ন টেরিটরিজ নামে পরিচিত, এখনো দুই দেশের মধ্যে বিরোধের বিষয়। এ বিরোধের কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তিও সম্পাদিত হয়নি।
গত আগস্টে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বিতর্কিত ইতুরুপ দ্বীপ সফর করেন। জাপান এ সফরের প্রতিবাদ জানায়। এরপর গত অক্টোবরে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের সাখালিন অঞ্চলে গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহে হোক্কাইডো শিম্বুন পত্রিকার এক জাপানি সাংবাদিককে আটক করা হয়। এ ঘটনারও প্রতিবাদ জানিয়েছিল টোকিও।
এ ছাড়া ইউক্রেনের জন্য একটি জাপানি প্রতিষ্ঠানের ড্রোন বিক্রির ঘটনাকেও রাশিয়া বিরূপ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে সতর্কবার্তা দিয়েছিল। সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে আরও অবনতির দিকে গেছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কী বার্তা
জেটিআইয়ের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সর্বশেষ পদক্ষেপকে দেশটিতে বিদেশি কোম্পানির সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বৃহত্তর প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগেও নেসলে, আউশান, মেট্রোসহ বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের রাশিয়াভিত্তিক সম্পদ অস্থায়ী ব্যবস্থাপনায় নেওয়া হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া ছেড়ে যাওয়া বা দেশটিতে কার্যক্রম সীমিত করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর সম্পদ নিয়ে মস্কোর সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর বিরোধ ক্রমাগত বেড়েছে।
বিশ্লেষণগতভাবে জেটিআইয়ের ঘটনা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হলে কোনো প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক কার্যক্রমও কীভাবে ভূরাজনৈতিক বিরোধের অংশ হয়ে উঠতে পারে, সেটি এ ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে।
তবে রাশিয়া কেন বিশেষভাবে জেটিআইকে লক্ষ্য করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে বিষয়ে পুতিনের ডিক্রিতে নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এটি জাপানকে সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার পদক্ষেপ, নাকি রাশিয়ার বৃহত্তর পাল্টা নিষেধাজ্ঞা নীতির ধারাবাহিকতা—তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
সাতটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা রাশিয়ার হাতে যাওয়ার পর জেটিআইয়ের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম, চার হাজার কর্মীর কর্মসংস্থান এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক কোন দিকে যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয়।
