রায়পুরায় কয়েক মাসে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার, হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ২

৭ মিনিটে পড়ুন৮ বার পড়া হয়েছে

রায়পুরায় কয়েক মাসে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার পর একের পর এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে। সর্বশেষ ১৯ অক্টোবর ভেলুয়ারচর এলাকা থেকে তারেক রহমান নামে এক স্কুলশিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর আগে অক্টোবর মাসেই আরও কয়েকজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় কোথাও হত্যার অভিযোগ, কোথাও অস্বাভাবিক মৃত্যুর সন্দেহ এবং কোথাও পানিতে ডুবে মৃত্যুর দাবি সামনে এসেছে। ফলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত খুঁজে বের করা এবং প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে নিখোঁজ, চার দিন পর মিলল শিক্ষার্থীর মরদেহ

সর্বশেষ গত ১৯ অক্টোবর উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়নের ভেলুয়ারচর এলাকার একটি খালের পাশে ঝোপ ও কচুরিপানার মধ্য থেকে তারেক রহমানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সে ওই এলাকার মালয়েশিয়াপ্রবাসী জিয়াউর রহমানের ছেলে এবং স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর দুপুরে সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তারেক নিখোঁজ হয়। সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি এবং মাইকিং করেও তার সন্ধান না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ১৬ অক্টোবর রায়পুরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

পরদিন বাড়ির কাছের একটি কাঠবাগান থেকে তার ব্যবহৃত সাইকেল উদ্ধার করা হয়। পরে ১৯ অক্টোবর স্থানীয়রা খালের পাশে ঝোপের মধ্যে একটি মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি তারেকের বলে শনাক্ত করেন।

তারেকের মা নাসিমা আক্তার ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে এবং এ ঘটনায় কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

নিখোঁজের চার দিন পর নদে মিলল অটোরিকশাচালকের মরদেহ

এর এক দিন আগে, ১৮ অক্টোবর উপজেলার আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের হাসনাবাদ এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে আরমান ফকির নামে এক অটোরিকশাচালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি নলবাটা গ্রামের বাসিন্দা।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে দিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন পর নদে মরদেহ ভেসে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন।

পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। মরদেহের বিভিন্ন অংশ পচে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে আরমান বলে শনাক্ত করলেও পুলিশের পক্ষ থেকে পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল।

আরমানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে তদন্তের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তাই এ ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড বলে নিশ্চিত করার মতো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে চালককে হত্যার অভিযোগ, গ্রেপ্তার দুই

রায়পুরায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে অটোরিকশাচালক মনির হোসেনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।

চরসুবুদ্ধি এলাকার বাসিন্দা মনির গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর সন্ধান না পেয়ে থানায় জিডি করেন। পরে ৫ অক্টোবর আদিয়াবাদ ইউনিয়নের শিকদারপাড়ার কাছে একটি বিলের কচুরিপানার মধ্য থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করে পিবিআই। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে মনিরকে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় আসাদ মিয়া ওরফে এরশাদ এবং জাহিদুল মিয়া নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পিবিআইয়ের প্রাথমিক তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে একজন মনিরের অটোরিকশা ভাড়া করেন। পরে আরেকজন ওই অটোরিকশায় ওঠেন। তাঁরা চালককে নির্জন এলাকায় নিয়ে গিয়ে বেল্ট দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর মরদেহ কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে রেখে অটোরিকশাটি নিয়ে যাওয়া হয়। পরে গাড়িটির বিভিন্ন অংশ খুলে বিক্রি করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অটোরিকশার চারটি ব্যাটারিও উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাটি দেখিয়েছে, যাত্রী পরিবহনের আড়ালে চালকদের লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ ছিনতাই ও হত্যার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

নদ থেকে উদ্ধার আরেক কিশোরের মরদেহ

গত ১৩ অক্টোবর রায়পুরার মরজাল ইউনিয়নের আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে রহমত উল্লাহ নামে এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি চর মরজাল গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

পরিবারের দাবি, নদীতে গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে ঘটনার বিস্তারিত পরিস্থিতি এবং মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অন্য ঘটনাগুলোর সঙ্গে এই মৃত্যুকে একই ধরনের অপরাধের অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

জুনেও নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা

চলতি বছরের জুন মাসেও রায়পুরায় নিখোঁজ এক শিশুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। গত ২৯ জুন পাড়াতলী ইউনিয়নের মধ্যনগর এলাকার কাছ থেকে সাত বছর বয়সী তাসকিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৫ জুন শিশুটি নিখোঁজ হয়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পরও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে স্থানীয়রা একটি পরিত্যক্ত জমিতে মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন।

পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। সে সময়ও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্তের কথা জানিয়েছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এই ঘটনাটিও এলাকায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে।

চালকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ পুলিশের

রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজের জিডি পাওয়ার পর পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। নিখোঁজ ব্যক্তি মুঠোফোন ব্যবহার করলে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাঁর অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তির সঙ্গে চলাফেরা করা লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদসহ বিভিন্নভাবে অনুসন্ধান চালানো হয়।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু ঘটনায় বেশি ভাড়ার প্রলোভন দেখিয়ে অটোরিকশাচালকদের নির্জন স্থানে নিয়ে হত্যা করে তাঁদের গাড়ি ছিনতাইয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এ কারণে চালকদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

রায়পুরা ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি সন্দেহজনক কিছু দেখলে পুলিশকে জানানোর এবং যাচাই ছাড়া কোনো গুজব না ছড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

রায়পুরায় একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের উদ্বেগের কারণ থাকলেও প্রতিটি ঘটনার প্রকৃতি ও মৃত্যুর কারণ এক নয়। কোথাও হত্যার অভিযোগে আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে, কোথাও তদন্ত চলছে, আবার কোথাও পরিবারের দাবি ও ময়নাতদন্তের ফলের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই এখন স্থানীয়দের প্রধান দাবি।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।