শিগগিরই প্যারিস ‘মুসলিম শহরে’ পরিণত হবে, দাবি ট্রাম্পের

৬ মিনিটে পড়ুন৪ বার পড়া হয়েছে

ফ্রান্সে সাম্প্রতিক সহিংস বিক্ষোভ ও লুটপাটের জন্য অভিবাসননীতিকে দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর উচিত দেশের সীমান্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শিগগিরই প্যারিস একটি ‘মুসলিম শহরে’ পরিণত হবে। তবে ফ্রান্সের চলমান অস্থিরতার জন্য অভিবাসীদের দায়ী করার পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন। ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশটিতে যা ঘটছে, তার মূল কারণ অভিবাসন; বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা বা অন্য কোনো সমস্যা নয়। এ সময় তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করারও আহ্বান জানান।

ফরাসি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অতীতের একটি কথোপকথনের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, তিনি অনেক আগেই ম্যাখোঁকে সতর্ক করেছিলেন যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষকে ফ্রান্সে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিলেও ফ্রান্স সেই পথে এগোয়নি।

ট্রাম্প আরও সতর্ক করেন, ইউরোপ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে মহাদেশটির ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাঁর এসব বক্তব্যে অভিবাসনকে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে প্যারিসের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যাগত পরিবর্তন সম্পর্কে নিজের দাবির পক্ষে কোনো পরিসংখ্যান বা প্রমাণ উপস্থাপন করেননি তিনি।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকট থেকে বিক্ষোভের সূত্রপাত

ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল বিদ্যালয়গুলোর দুরবস্থা, শিক্ষকের সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ থেকে। কয়েক সপ্তাহ আগে শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ শুরু করে। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, মজুরি বৃদ্ধি এবং সামাজিক ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি স্থানে পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীদের একাংশের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে।

লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক সিটি হল আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সহিংসতার ঘটনায় দেশজুড়ে দুই হাজার চার শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছিল। এ ছাড়া প্যারিসের কিছু অংশসহ কয়েকটি এলাকায় রাতের কারফিউ জারি করা হয়।

ফরাসি সরকার সহিংসতার জন্য উগ্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও সুযোগসন্ধানী অপরাধীদের দায়ী করেছে। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সব মানুষের উদ্দেশ্য বা পরিচয় এক নয়। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ, অর্থনৈতিক অসন্তোষ এবং সংঘর্ষের সুযোগে লুটপাটের ঘটনাগুলোকে আলাদাভাবে বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।

অভিবাসনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক

ফ্রান্সের অস্থিরতাকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত করেছেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, ফ্রান্সের পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সতর্কবার্তা এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি গ্রহণ না করলে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

কানসাসে এক নির্বাচনী সমাবেশেও তিনি ফ্রান্সের সহিংসতা নিয়ে মন্তব্য করেন। সেখানে অভিবাসী, জিহাদি ও কমিউনিস্টদের দায়ী করে তিনি দেশটির পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক প্রচারের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাঁর এসব বক্তব্য অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও জোরালো করার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ কয়েকজন রিপাবলিকান নেতাও ফ্রান্সের পরিস্থিতিকে অভিবাসন ও সীমান্তনীতির ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁদের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতি এবং ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে তুলনা করা হয়েছে।

তবে ফ্রান্সের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অসন্তোষের মতো একাধিক কারণ উঠে এসেছে। এসব কারণ বাদ দিয়ে শুধু অভিবাসনকে সহিংসতার জন্য দায়ী করার পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

‘মুসলিম শহর’ মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক

প্যারিসকে ‘মুসলিম শহরে’ পরিণত হওয়ার পথে বলে ট্রাম্পের মন্তব্য অভিবাসন ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তাঁর বক্তব্যে ফ্রান্সের অস্থিরতাকে মুসলিম জনগোষ্ঠী ও অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত করা হলেও, শহরটির ভবিষ্যৎ জনসংখ্যাগত পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়নি।

ফ্রান্সে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অভিবাসন দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধর্মীয় পরিচয়, অভিবাসীদের অধিকার এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। সাম্প্রতিক সহিংসতা সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।

তবে বিক্ষোভে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং তাদের কর্মকাণ্ডের প্রকৃতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় বা অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করার মাধ্যমে পরিস্থিতির প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

ফ্রান্সে চলমান অস্থিরতা মোকাবিলায় একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক অসন্তোষ ও শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যার সমাধান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য ও রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও জোরালো হচ্ছে।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।