ফ্রান্সের দাঙ্গায় উন্মোচিত গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট
ফ্রান্সজুড়ে সহিংস বিক্ষোভ, ব্যাপক লুটপাট ও সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ দেশটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং অর্থনৈতিক সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) সহিংসতায় রূপ নেয়। প্যারিস, মার্সেই, লিয়ঁ ও বোর্দোসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। ঐতিহাসিক শহর লিমোজের সিটি হলে আগুন দেওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতির ভয়াবহতা প্রকাশ করেছে।
সপ্তাহান্তের সহিংসতায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। দেশটির বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। তবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সবাই সহিংসতায় জড়িত ছিলেন না। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থার প্রতিবাদে কয়েক লাখ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবেও রাস্তায় নেমেছিলেন।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, দেশটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। তবে সরকারের প্রতিক্রিয়া ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত ঐতিহাসিক স্থাপনা
সহিংসতার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে। সেখানে ঐতিহাসিক সিটি হলে আগুন দেওয়ার পর ভবনটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আগুনে ভবনের ঘড়ি-টাওয়ারের চূড়া ধসে পড়ে। ফ্রান্সের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই ভবনের ক্ষতি দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
প্যারিস, মার্সেই ও বোর্দোসহ বিভিন্ন শহরে দোকানপাটে লুটপাট, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের কারণে কয়েকটি এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।
ফরাসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। কয়েকটি শহরে রাতের কারফিউ জারি করা হয়। সরকার পরবর্তী বিক্ষোভ মোকাবিলায় আরও বড় নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়েছে। আগামী শনিবারের কর্মসূচিতে পুলিশ ও সেনাসদস্যদের সমন্বয়ে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু স্বীকার করেছেন, সপ্তাহান্তের সহিংসতা মোকাবিলায় প্রশাসনের প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে দুর্বলতা এবং পুলিশের অপর্যাপ্ত ও যথাযথভাবে সমন্বিত না হওয়া মোতায়েন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তোলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজও সরকারের ভুলের দায় স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে, সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে প্রায় ২০০ তদন্তকারীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। লিমোজের সিটি হলে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সন্দেহভাজন একজনকে মঙ্গলবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা থেকে বৃহত্তর অসন্তোষ
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক অস্থিরতার সূত্রপাত হয়েছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ার অভিযোগ থেকে। শরৎকালীন শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, অনেক স্কুলের অবকাঠামো জরাজীর্ণ, প্রয়োজনীয় শিক্ষকের অভাব রয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব, জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে অসন্তোষ। সাধারণ মানুষের একটি অংশ মনে করছে, অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য জনসেবায় প্রত্যাশিত উন্নতি হচ্ছে না।
শনিবারের বিক্ষোভে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শ্রমিক, বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের কর্মী এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষ অংশ নেন। তাঁদের অনেকেই শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানান। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে কিছু এলাকায় মুখোশধারী গোষ্ঠীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট ছড়িয়ে পড়ে।
২০১৮ সালে জ্বালানির ওপর কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করছেন বিশ্লেষকেরা। সেই আন্দোলনও পরে বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষের প্রতিফলনে পরিণত হয়েছিল। তবে এবারের আন্দোলন একক কোনো সংগঠনের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে না; এতে বিভিন্ন শ্রেণি ও মতাদর্শের মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে।
শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো আগামী বৃহস্পতিবার ও শনিবার আরও বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত করতে আগ্রহী কর্মীরাও শনিবার দেশজুড়ে কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। নভেম্বর মাসে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর ধর্মঘটের পরিকল্পনা থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজনৈতিক অচলাবস্থা বাড়াচ্ছে সংকট
ফ্রান্সের চলমান অস্থিরতা এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন দেশটির রাজনীতি গভীর বিভাজনের মুখে। ২০২৪ সালে আগাম নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পার্লামেন্টে কোনো একক রাজনৈতিক শক্তির নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে সরকার গঠন, বাজেট পাস এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে বারবার বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর মধ্যপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি জনসমর্থনও কমেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই পরিস্থিতিকে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরছে। আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা থাকায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
উগ্র ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দলের নেতা মেরিন লো পেন কঠোর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও অভিবাসননীতির ওপর জোর দিচ্ছেন। অন্যদিকে, বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশো সরকারের পুলিশি কৌশলের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, সরকারের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু অবশ্য সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠী ও অপরাধীদের দায়ী করেছেন।
তবে সহিংসতার জন্য একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক গোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, কিছু উগ্রপন্থী কর্মী সহিংসতায় জড়িত থাকলেও ব্যাপক লুটপাটের পেছনে সুযোগসন্ধানী অপরাধীদের ভূমিকাও থাকতে পারে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের দাবি এবং সহিংস কর্মকাণ্ডকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সরকারি ঋণ ও দুর্বল অর্থনীতি বাড়াচ্ছে চাপ
ফ্রান্সের রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১১৯ শতাংশে পৌঁছেছে। জুনের শেষ নাগাদ সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ইউরো।
সরকারি ব্যয়, করনীতি ও বাজেট ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের মধ্যে ঋণের এই বোঝা অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কাঠামোগত সংস্কার বিলম্বিত হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছর মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ফ্রান্সকে রেকর্ড প্রায় ৩৪ হাজার কোটি ইউরো ঋণ সংগ্রহ করতে হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ১২২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মাত্র ০ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। উচ্চ সরকারি ব্যয়, ঋণের চাপ এবং বিনিয়োগে দুর্বলতা দেশটির অর্থনীতির গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে আর্থিক বাজারেও। মঙ্গলবার ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার ৪ দশমিক ৯ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছায়, যা প্রায় ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি। সরকারি ঋণের সুদের হার বাড়লে রাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও অন্যান্য খাতে ব্যয় পরিচালনা করা সরকারের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনেও উদ্বেগ
সহিংসতা ফ্রান্সের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনশিল্পের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করেছে। দেশটির অর্থনীতিতে পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। কিন্তু বড় শহরগুলোতে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নিরাপত্তাহীনতার দৃশ্য আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় পর্যটকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
সুপারমার্কেট চেইন ক্যারিফোর জানিয়েছে, লুটপাট ও সম্পদের ক্ষতির কারণে তাদের কয়েক কোটি ইউরোর ক্ষতি হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ছোট ব্যবসা, খুচরা বিক্রেতা, পরিবহন এবং পর্যটননির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো আরও চাপের মুখে পড়তে পারে।
ইতিমধ্যে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকা এবং সরকারি ঋণের বোঝা বাড়ার মধ্যে নতুন করে সহিংসতা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপেও সাধারণ মানুষের হতাশার প্রতিফলন দেখা গেছে। ইপসোস-বিভিএর একটি জরিপে ৮৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেছেন, ফ্রান্সের পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। আর ৯৮ শতাংশ উত্তরদাতা দেশটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
সব মিলিয়ে, ফ্রান্সের বর্তমান অস্থিরতা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; বরং অর্থনৈতিক চাপ, জনসেবার দুরবস্থা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং সরকারের প্রতি আস্থার সংকটের সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারকে একদিকে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষ মোকাবিলা করতে হবে।
