যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা, দুই শিশুসহ নিহত ৭
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার মধ্যেও ইসরায়েলি হামলায় দুই শিশুসহ অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) উপত্যকাটির বিভিন্ন এলাকায় চালানো হামলা ও গুলিবর্ষণে আহত হয়েছেন আরও ১০ জন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন এক দম্পতিও। নতুন করে প্রাণহানির এ ঘটনা যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গাজার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরের পশ্চিমে আল-সাওয়ারহা কবরস্থানের কাছে ইসরায়েলি হামলায় একজন নিহত ও একজন আহত হন। উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরের আল-কুসাইস এলাকায় ড্রোন হামলায় আহত আরেকজন পরে মারা যান। এ ছাড়া গাজা সিটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেইতুন এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় একজন এবং মধ্য গাজার ওয়াদি গাজা এলাকায় গুলিতে এক শিশু নিহত হয়।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলে, আল-শিফা হাসপাতালের কাছে একটি আবাসিক বাড়িতে। সেখানে ইসরায়েলি সামরিক হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে এক দম্পতি নিহত হন। এ হামলায় আরও চারজন আহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে তিনজন নারী। হামলার পর বাড়িটিতে আগুন ধরে যায়। পরে বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। একটি পরিবারের এমন পরিণতি যুদ্ধের ভয়াবহতার পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের অসহায় অবস্থাও সামনে এনেছে।
দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের দক্ষিণে কিজান আবু রাশওয়ান এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে আরেক শিশু নিহত হয়েছে। একই এলাকার উত্তরে হামাদ সিটি এবং খান ইউনিসের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে গুলিবর্ষণে আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন। তাঁদের মধ্যে একজন নারী ও দুটি শিশু রয়েছে।
এদিকে, পূর্ব গাজা সিটির তুফাহ এলাকায় রাতভর আবাসিক বাড়ি ও বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ এবং গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ইসরায়েলি ট্যাংক ও কোয়াডকপ্টার ড্রোন থেকে গুলি চালানো হয়। উপত্যকার উত্তর উপকূলে ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজ থেকেও গোলা ও গুলি ছোড়া হয়েছে। খান ইউনিসের পূর্বাঞ্চলে বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি কতটা নিরাপত্তা দিতে পারছে?
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি গাজার মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশা তৈরি করেছিল। কিন্তু এরপরও বিভিন্ন সময়ে হামলা, গোলাবর্ষণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় সেই প্রত্যাশা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো যখন ধ্বংসস্তূপের পাশে কিংবা অস্থায়ী তাঁবুতে দিন কাটাচ্ছে, তখন নতুন করে প্রাণহানি তাদের নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলা ও গুলিবর্ষণে অন্তত ১ হাজার ৫২২ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজার ৪২১ জন আহত হয়েছেন। এসব পরিসংখ্যান গাজার বেসামরিক মানুষের ওপর চলমান সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
একদিকে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে স্থায়ী শান্তি ও পুনর্গঠনের আশা, অন্যদিকে ধারাবাহিক প্রাণহানি—এই বৈপরীত্য গাজার পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশেষ করে শিশু ও নারীসহ সাধারণ মানুষের প্রাণহানি যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
