যুদ্ধ থামাতে জেলেনস্কিকে ট্রাম্পের কড়া চাপ, পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন দূত

৬ মিনিটে পড়ুন৪ বার পড়া হয়েছে

রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসানে শান্তিচুক্তি করতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর চাপ বাড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, জেলেনস্কিকে যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হতে হবে। অন্যথায় ইউক্রেনের জনগণ আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি মেনে নাও নিতে পারেন। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন।

ট্রাম্প বলেন, জেলেনস্কি চাইলে রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন। তাঁর মতে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট এর আগেও শান্তিচুক্তির সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে জেলেনস্কির সঙ্গে নিজের উত্তপ্ত বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, সে সময় তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করলে ইউক্রেন আরও ভালো শর্তে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারত।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের দ্রুত অবসান চান এবং এ জন্য কিয়েভের নেতৃত্বের ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন। তবে কী শর্তে শান্তিচুক্তি হবে, ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে এবং দেশটির নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের এখনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।

জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক মার্কিন দূতের

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের দিনই নরওয়ের রাজধানী অসলোতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। আলোচনায় ইউরোপীয় নেতারাও অংশ নেন। বৈঠকে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য পথ, ইউক্রেনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

বৈঠক শেষে জেলেনস্কি জানান, শান্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ইউক্রেনের কিছু সুনির্দিষ্ট ধারণা রয়েছে। এসব প্রস্তাব রাশিয়ার কাছে পৌঁছে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে চান তিনি। একই সঙ্গে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী যেকোনো আলোচনায় দেশটির নিজস্ব প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন জেলেনস্কি।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের অবস্থান হলো, যুদ্ধের অবসান প্রয়োজন হলেও এমন কোনো চুক্তি গ্রহণযোগ্য হবে না, যা দেশটির সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। এ কারণে শান্তিচুক্তির আলোচনায় শুধু যুদ্ধ বন্ধ নয়, যুদ্ধের পর রাশিয়ার সম্ভাব্য পদক্ষেপ মোকাবিলার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করবেন উইটকফ

অসলোতে জেলেনস্কি ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শেষে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের জন্য রওনা হওয়ার কথা রয়েছে মার্কিন দূত উইটকফের। বুধবার (২১ অক্টোবর) রাশিয়ায় এ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। আলোচনায় ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের জন্য নতুন প্রস্তাব নিয়ে কথা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ এমন সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কেও টানাপোড়েন বাড়ছে। রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত এবং মস্কোর ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পদক্ষেপ ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলোর একাংশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এদিকে, ইউক্রেনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কতামূলক গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান আবার শুরু হয়েছে। এই সহযোগিতা ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে কিয়েভ।

রুশ প্রেসিডেন্টকে মার্কিন নাগরিককে মুক্তির অনুরোধ

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি রাশিয়ায় আটক যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক স্টিফেন হাবার্ডের মুক্তির বিষয়টিও সামনে এনেছেন ট্রাম্প। ৭৪ বছর বয়সী সাবেক মার্কিন শিক্ষক হাবার্ড রাশিয়ায় ভাড়াটে যোদ্ধা-সংক্রান্ত অভিযোগে কারাবন্দি রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে অন্যায়ভাবে আটক ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি পুতিনের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন এবং হাবার্ডকে মুক্তি দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে শিগগিরই অগ্রগতি হতে পারে। তবে হাবার্ডের মুক্তির ব্যাপারে রাশিয়ার পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া যায়নি।

শান্তির সম্ভাবনা, নাকি নতুন কূটনৈতিক চাপ?

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি করলেও দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। ট্রাম্প দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য জেলেনস্কির ওপর চাপ দিচ্ছেন। অন্যদিকে, ইউক্রেনের নেতৃত্ব চাইছে, যেকোনো শান্তিচুক্তিতে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

অসলোতে আলোচনা এবং উইটকফের সম্ভাব্য মস্কো সফর শান্তিপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে আলোচনায় নতুন কোনো প্রস্তাব চূড়ান্ত হবে কি না, কিংবা পুতিন ও জেলেনস্কি সমঝোতার শর্তে একমত হবেন কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে ইউক্রেনের অবকাঠামো, অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হলেও একটি কার্যকর ও স্থায়ী শান্তিচুক্তি অর্জনের জন্য উভয় পক্ষের সম্মতি এবং নিরাপত্তার বাস্তব নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।