মোদির বাসভবনের কাছে ঐতিহাসিক মসজিদ উচ্ছেদের নোটিশ, ৬ দিনের আলটিমেটাম

৬ মিনিটে পড়ুন৩ বার পড়া হয়েছে

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের কাছে অবস্থিত ঐতিহাসিক রেসকোর্স মসজিদ খালি করার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির ভূমি ও উন্নয়ন দপ্তর (এলঅ্যান্ডডিও)। গত ১৯ অক্টোবর জারি করা নোটিশে ছয় দিনের মধ্যে মসজিদটি খালি করতে বলা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, মসজিদটি সরকারি জমিতে অবৈধভাবে নির্মিত। তবে মুসলিম সংগঠনগুলোর দাবি, মসজিদটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃত এবং এর ধর্মীয় ও আইনি মর্যাদা রয়েছে। এ অবস্থায় মসজিদটি রক্ষায় সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছে বিভিন্ন সংগঠন।

নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের কাছাকাছি অবস্থিত মসজিদটি ‘রেসকোর্স মসজিদ’ নামে পরিচিত। মসজিদটির ইমাম ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, গত ৭ অক্টোবর এর বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। পরে ১৯ অক্টোবর মসজিদ খালি করার নোটিশ জারি করা হয়। মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় মুসলিম ধর্মীয় সংগঠন ও রাজনৈতিক নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সরকারি জমি নিয়ে বিরোধ, ঐতিহাসিক মর্যাদার দাবি

ভূমি ও উন্নয়ন দপ্তরের বক্তব্য, মসজিদটি সরকারি জমিতে অবস্থিত এবং সেখানে স্থাপনাটি অননুমোদিতভাবে নির্মিত হয়েছে। অন্যদিকে, মসজিদটির পক্ষে অবস্থান নেওয়া সংগঠনগুলোর দাবি, স্থাপনাটি দীর্ঘদিনের পুরোনো এবং নয়াদিল্লি পৌর পরিষদের (এনডিএমসি) ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় এর নাম রয়েছে।

জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১৯৭৭ সালের দিল্লি গেজেটেও মসজিদটির উল্লেখ রয়েছে। সংগঠনটি মসজিদটিকে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি হিসেবেও বিবেচনা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মসজিদের পাশে একটি কবরস্থানও রয়েছে, যেটি রক্ষার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

মসজিদটির ইমাম মোহাম্মদ হারুন জানিয়েছেন, প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি এই মসজিদের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর অভিযোগ, গত ছয় মাস ধরে দিল্লি ওয়াক্‌ফ বোর্ডের কাছে আবেদন জানিয়েও কার্যকর সহায়তা পাননি। তাঁর দাবি, ২০২১ সালের একটি জরিপেও মসজিদটিকে অবৈধ স্থাপনা বা দখল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।

তবে সরকারি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও মসজিদ-সংশ্লিষ্টদের দাবি নিয়ে বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। স্থাপনাটির জমির আইনি অবস্থান এবং ঐতিহাসিক মর্যাদা নিয়ে সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মসজিদ রক্ষায় সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চায় জমিয়ত

মসজিদটি রক্ষায় গত ১৯ অক্টোবর ভারতের কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর সঙ্গে দেখা করে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের একটি প্রতিনিধিদল। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুহাম্মদ হাকিমুদ্দিন কাসমির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দেয়।

স্মারকলিপিতে মসজিদ ও পাশের কবরস্থান রক্ষার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত প্রতিবেদন নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মসজিদ ভাঙা বা অন্য কোনো উচ্ছেদমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ারও দাবি জানায় সংগঠনটি। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ পুনরায় চালু করা এবং মুসল্লিদের মসজিদে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জমিয়তের প্রতিনিধিদলকে রিজিজু বিষয়টি দেখার এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সর্বাত্মক চেষ্টা করার আশ্বাস দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাইকোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি, রাজনৈতিক নেতাদের উদ্বেগ

মসজিদ উচ্ছেদের নোটিশকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন, মসজিদটি ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃত বলে দাবি করা হলেও সংশ্লিষ্ট বোর্ড কেন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

ওয়াইসি দিল্লি ওয়াক্‌ফ বোর্ডের কার্যক্রম ও ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, বোর্ডের প্রশাসনিক পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তার কারণে মসজিদটির আইনি অবস্থান রক্ষার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এদিকে, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ জানিয়েছে, উচ্ছেদ নোটিশের বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। সংগঠনটি আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মসজিদটিতে কোনো ধরনের উচ্ছেদ বা ভাঙার কার্যক্রম বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছে।

আম আদমি পার্টির নেতা ও দিল্লি ওয়াক্‌ফ বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আমানতুল্লাহ খানও মসজিদটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কাশ্মীরের ধর্মীয় নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুকও ঐতিহাসিক মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।

মসজিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

ছয় দিনের মধ্যে মসজিদ খালি করার নোটিশকে কেন্দ্র করে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, স্থাপনাটির আইনি অবস্থান কী এবং উচ্ছেদের আগে সংশ্লিষ্ট দাবিগুলো যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করা হবে কি না।

একদিকে সরকারি জমিতে অননুমোদিত স্থাপনার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অবস্থান, অন্যদিকে মসজিদটির ঐতিহাসিক মর্যাদা ও ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতির দাবি—দুইয়ের মধ্যে বিরোধের সমাধান এখনো হয়নি। বিষয়টি আদালতে গড়ালে জমির মালিকানা, ঐতিহাসিক নথি ও সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মসজিদটির বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার অভিযোগ এবং মুসল্লিদের প্রবেশে বাধার বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করেছে। আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত উচ্ছেদমূলক পদক্ষেপ স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছে মুসলিম সংগঠনগুলো। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপের দিকেই নজর রয়েছে।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।