আইনের শাসন সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ, তবু পিছিয়ে মৌলিক অধিকার ও দেওয়ানি বিচারে

৫ মিনিটে পড়ুন৩ বার পড়া হয়েছে

বিশ্বের ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে আইনের শাসন সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের (ডব্লিউজেপি) প্রকাশিত ২০২৬ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম, যা আগের বছরের ১২৫তম অবস্থানের চেয়ে দুই ধাপ উন্নত। তবে অবস্থানের এই অগ্রগতির মধ্যেও মৌলিক অধিকার, দেওয়ানি বিচার এবং সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সামগ্রিক স্কোর দাঁড়িয়েছে ১-এর মধ্যে ০.৩৯৩। ২০২৫ সালে এই স্কোর ছিল ০.৩৯১। অর্থাৎ এক বছরে স্কোরে সামান্য উন্নতি হয়েছে। বৈশ্বিক গড় স্কোর ০.৫৫ হওয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনো গড়ের যথেষ্ট নিচে।

বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর আইনের শাসনের অবস্থা মূল্যায়নে ডব্লিউজেপির এই সূচক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এতে শুধু আইন ও বিচারব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক কাঠামো নয়, বরং সরকারি ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং বিচার পাওয়ার বাস্তব সুযোগও বিবেচনায় নেওয়া হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আইনের শাসন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ অঞ্চলে নেপাল ৭১তম, শ্রীলঙ্কা ৭৪তম এবং ভারত ৮৮তম স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের পরে রয়েছে পাকিস্তান, ১৩১তম স্থানে, এবং আফগানিস্তান, ১৪২তম স্থানে।

এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি ইতিবাচক হলেও আন্তর্জাতিক তুলনায় দেশটির অবস্থান এখনো দুর্বল। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের তুলনায় পিছিয়ে থাকা বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা, নাগরিক অধিকার এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।

মৌলিক অধিকারে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থান

সূচকের আটটি মানদণ্ডের মধ্যে মৌলিক অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে দুর্বল। এ ক্ষেত্রে ০.৩০ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে ১৩৩তম।

মৌলিক অধিকার সূচকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে স্বীকৃত অধিকার সুরক্ষা এবং নাগরিক স্বাধীনতার বিভিন্ন দিক বিবেচনা করা হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দেখায় যে সামগ্রিক স্কোর বাড়লেও নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় আরও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে।

দেওয়ানি বিচারেও বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। এ ক্ষেত্রে দেশটির অবস্থান ১৩২তম এবং স্কোর ০.৩৬। দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তি, বিচার পাওয়ার সুযোগ এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়নে এই সূচক গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে সরকারি ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১১১তম, দুর্নীতির অনুপস্থিতি সূচকে ১১৩তম, ফৌজদারি বিচারে ১১৭তম এবং বিধি-বিধানের প্রয়োগে ১২৪তম অবস্থানে রয়েছে।

তুলনামূলক ভালো অবস্থান দেখা গেছে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সূচকে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৭তম। মুক্ত সরকার সূচকে রয়েছে ১০৬তম অবস্থান।

এক বছরের উন্নতি, পাঁচ বছরের হিসাব ভিন্ন

বার্ষিক সূচকে বাংলাদেশের স্কোর বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি চিত্র পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। ডব্লিউজেপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সামগ্রিক স্কোর প্রায় ০.৪০ থেকে ০.৩৯-এ নেমেছে, যা প্রায় ০.৮ শতাংশ অবনতি নির্দেশ করে।

সাম্প্রতিক এক বছরে আটটি মানদণ্ডের মধ্যে সরকারি ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতির অনুপস্থিতি এবং বিধি-বিধানের প্রয়োগে উন্নতি হয়েছে। অন্যদিকে মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচার—এই পাঁচ ক্ষেত্রে স্কোরের অবনতি হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ডব্লিউজেপির ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের বছরের তুলনায় অবনতির হার কিছুটা কমলেও আইনের শাসনে উন্নতির তুলনায় অবনতি বেশি। সূচকের আওতাধীন দেশগুলোর ৬২ শতাংশে আইনের শাসন-সম্পর্কিত স্কোর কমেছে, বিপরীতে উন্নতি হয়েছে ৩৮ শতাংশ দেশে।

সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; আইনের প্রয়োগ, বিচার বিভাগের কার্যকারিতা, মৌলিক অধিকার সুরক্ষা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা বাড়ানো, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সরকারি ক্ষমতার জবাবদিহি জোরদার করার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সূচকের দুই ধাপ অগ্রগতি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হলেও দীর্ঘমেয়াদে অবস্থান উন্নত করতে হলে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা জরুরি। বিশেষ করে মৌলিক অধিকার ও দেওয়ানি বিচারব্যবস্থায় উন্নতি ছাড়া আইনের শাসনের সামগ্রিক মান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করা কঠিন হবে।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।