‘মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছি’: সাজেক থেকে ফেরার পথে গোলাগুলিতে আতঙ্কিত পর্যটকেরা

৫ মিনিটে পড়ুন৪ বার পড়া হয়েছে

‘সারা রাস্তা আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। মনে হচ্ছে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি।’ রাঙামাটির সাজেক থেকে খাগড়াছড়িতে ফেরার পথে গোলাগুলির মধ্যে পড়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে এভাবেই নিজের আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন পর্যটক মোহাম্মদ নাঈম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পরিবারের সদস্য, দুই শিশুসন্তান এবং বৃদ্ধ মা-বাবা ও শ্বশুর-শাশুড়িসহ ১৯ জনের একটি দল।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সাজেকের উজোবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উত্তেজনা ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে সাজেকে আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটকের নিরাপদে ফিরে আসা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিরাপত্তা পাহারায় পর্যটকদের খাগড়াছড়ির দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

সড়কে বাধা, এরপর গোলাগুলি

সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধের কারণে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সাজেক-দীঘিনালা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং সড়কে বাধা তৈরি করে অবরোধকারীরা যানবাহন আটকে দেন।

সকাল সাড়ে আটটার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তায় পর্যটকদের বহর সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা হয়। উজোবাজার এলাকায় পৌঁছানোর পর বহরটি বাধার মুখে পড়ে। পর্যটকদের নির্বিঘ্নে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেন।

তবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ এবং গুলির ঘটনা ঘটে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) ভাষ্য অনুযায়ী, সশস্ত্র ইউপিডিএফ সদস্যরা পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। ইউপিডিএফ অভিযোগটি অস্বীকার করেছে।

রাঙামাটির পুলিশ সুপারের বরাতে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, ঘটনায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন। তবে কোনো পর্যটক আহত হননি বলে পুলিশ জানিয়েছে।

শিশুদের কান্না, আতঙ্কে কেটেছে ফেরার পথ

সাজেক থেকে ফিরে পর্যটকেরা জানিয়েছেন, গোলাগুলির শব্দে গাড়ির ভেতরে থাকা শিশু ও নারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ঢাকার উত্তরা থেকে বেড়াতে যাওয়া পর্যটক রাশেদ আহম্মেদ বলেন, অবরোধের কারণে তাঁদের পরিকল্পিত ভ্রমণসূচি পরিবর্তন করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের আগেই সাজেক ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে হয়েছিল।

উজোবাজার এলাকায় তাঁদের গাড়ি আটকে যাওয়ার পর হঠাৎ গুলির শব্দ শোনা যায়। সঙ্গে থাকা শিশুরা কান্নাকাটি শুরু করে। একপর্যায়ে তাঁদের গাড়ি লক্ষ্য করে ঢিলও ছোড়া হয় বলে জানান রাশেদ। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় তাঁরা বিপজ্জনক এলাকাটি অতিক্রম করেন।

আরেক পর্যটক মাইন উদ্দিনও জানিয়েছেন, সড়কে গাড়ি আটকে যাওয়ার পর লোকজনকে ছোটাছুটি করতে দেখে তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর আগপর্যন্ত কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় ছিলেন তাঁরা।

অবরোধের পেছনে কী?

অবরোধকারী সংগঠন দুটির দাবি, সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস—সন্তু লারমা পক্ষ) সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এসব সদস্যকে এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে তারা কর্মসূচি পালন করছে।

অন্যদিকে, জেএসএসের পক্ষ থেকে তাদের কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী নেই বলে দাবি করা হয়েছে। এ বিরোধের কারণে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্রটিতে যাতায়াত বারবার বিঘ্নিত হচ্ছে।

এর আগে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছিল। দাবি পূরণ না হওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ শুরু হয়।

সাময়িক বন্ধ সাজেক পর্যটনকেন্দ্র

পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে। প্রশাসনের নির্দেশনায় পর্যটকদের নিরাপদে এলাকা ছাড়তে বলা হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় আটকে পড়া পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়া হয়।

ঘটনাটি শুধু পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনাই ব্যাহত করেনি; সাজেকের পর্যটননির্ভর ব্যবসা, পরিবহন, রিসোর্ট ও কটেজের ওপরও চাপ তৈরি করেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে পর্যটক প্রবেশের সুযোগ সীমিত থাকতে পারে।

সাজেকের এই ঘটনা পাহাড়ি অঞ্চলে নিরাপদ যাতায়াত, স্থানীয় বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনেছে।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।