৭৭৭ টাকার সরকারি এলপিজি কোথায়? বেসরকারি সিলিন্ডারে ভরে বিক্রির অভিযোগ

৬ মিনিটে পড়ুন১৩ বার পড়া হয়েছে

দেশে কম দামে বিক্রির জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় সরবরাহ করা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার সাধারণ গ্রাহকের নাগালের বাইরে থাকলেও বেসরকারি সিলিন্ডারে ভরে তা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ১২ দশমিক ৫ কেজির সরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য ৭৭৬ টাকা ৯৩ পয়সা। অন্যদিকে, অক্টোবর মাসে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি মূল্যে বরাদ্দ নেওয়া গ্যাসের একটি অংশ সাধারণ ক্রেতার কাছে বিক্রি না করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিলিন্ডারে ভরে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।

সরকারি এলপিজি বিতরণে অনিয়ম, ভুয়া অনুমতিপত্রের ব্যবহার এবং ডিলারদের একাংশের বিরুদ্ধে গ্যাস সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এতে কম দামের সরকারি গ্যাস প্রকৃত গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বরাদ্দের গ্যাস যাচ্ছে কোথায়?

সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস পিএলসির উৎপাদিত গ্যাসের একটি অংশ সেনাবাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরবরাহ করা হয়। বাকি গ্যাসের একটি অংশ তালিকাভুক্ত ডিলারদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ গ্রাহকের জন্য বরাদ্দ করা গ্যাসের একটি অংশ নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রে না পৌঁছে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের গুদাম বা বোতলজাতকরণ স্থাপনায় চলে যাচ্ছে। সেখানে সরকারি সিলিন্ডার থেকে গ্যাস বের করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিলিন্ডারে ভরা হচ্ছে। পরে তা সাধারণ বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

এলপি গ্যাস পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি এলপিজি বিতরণের জন্য যমুনা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, পদ্মা অয়েল ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েলকে বিভিন্ন পরিমাণে সিলিন্ডার বরাদ্দ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সরাসরি ১ লাখ ৪৮ হাজার ৬৩৪টি সিলিন্ডার সরবরাহ করা হয়।

দেশজুড়ে সরকারি এলপিজি বিতরণের জন্য তালিকাভুক্ত ডিলার থাকলেও বরাদ্দ করা প্রতিটি সিলিন্ডার শেষ পর্যন্ত কার কাছে পৌঁছাচ্ছে, তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

‘কাগুজে ডিলার’ দিয়ে গ্যাস উত্তোলনের অভিযোগ

সরকারি এলপিজি বিতরণে অনিয়মের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে সামনে এসেছে কথিত ‘কাগুজে ডিলার’। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু অনুমোদিত ডিলারের নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র বা সাধারণ গ্রাহকের কাছে গ্যাস সরবরাহের কার্যকর নেটওয়ার্ক নেই। তারপরও তাঁদের নামে সরকারি মূল্যে সিলিন্ডার বরাদ্দ নেওয়া হচ্ছে।

কিছু ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি একাধিক ডিলারের অনুমতিপত্র ব্যবহার করে তাঁদের বরাদ্দ একসঙ্গে উত্তোলন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বরাদ্দের প্রকৃত ব্যবহার এবং গ্যাসের চূড়ান্ত গন্তব্য শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানেও ডিলারদের অনুমতিপত্র ব্যবহারে অনিয়মের বিষয়টি উঠে এসেছে। সংস্থাটির বিশেষ এনফোর্সমেন্ট টিম বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও এলপি গ্যাস পিএলসির কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে ডিলারদের অনুমতিপত্র ব্যবহারের অনিয়ম খতিয়ে দেখে।

অভিযানসংক্রান্ত তথ্যে একাধিক ডিলারের নামে বরাদ্দ উত্তোলনে ভুয়া অনুমতিপত্র এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বা জাল লাইসেন্স ব্যবহারের অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি গ্যাস অবৈধভাবে উত্তোলন করে বেসরকারি সিলিন্ডারে ভরার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় এসেছে।

বছরে ১৫০ কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ

সরকারি এলপিজি অবৈধভাবে সরিয়ে নিয়ে বেশি দামে বিক্রির কারণে বছরে অন্তত ১৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। এটি উত্থাপিত হিসাব; ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে, সরকারি এলপিজি বাজারে চাহিদার তুলনায় খুব সামান্য অংশ সরবরাহ করে। এলপি গ্যাস পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আমীর মাসুদ জানিয়েছেন, দেশের মোট এলপিজি বাজারে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ প্রায় ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। প্রয়োজনীয় উৎপাদন ও বিতরণ সক্ষমতা না থাকায় বাজারে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব সীমিত।

তিনি বলেন, সিলিন্ডার বিতরণে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিকের বিতরণব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। সরকারি গ্যাস বেসরকারি সিলিন্ডারে ভরে বিক্রির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি জানান, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সরবরাহ বাড়াতে অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা

সরকারি এলপিজির উৎপাদন ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে বাগেরহাটের মোংলায় ৮ হাজার ২০০ টন গ্যাস ধারণক্ষমতার ট্যাংক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া টাঙ্গাইলের কালিহাতী ও রাজাবাড়ীতে সংরক্ষণ এবং বোতলজাতকরণ অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন এলপি গ্যাস পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

সরকারি এলপিজির সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। অনুমোদিত ডিলারের লাইসেন্স যাচাই, বরাদ্দ ও উত্তোলনের ডিজিটাল হিসাব সংরক্ষণ এবং সিলিন্ডারের গন্তব্য পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগগুলোর তদন্ত সম্পন্ন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হলে কম দামের সরকারি গ্যাস সাধারণ ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পথ সুগম হবে।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।