বাবাকে ভিডিও কলে নির্যাতনের কথা জানিয়েছিলেন বর্ষা, কিছুক্ষণ পরই মিলল মৃত্যুর খবর
রাজধানীর মণিপুরীপাড়ায় জুমরাতুন নেছা বর্ষা (২৪) নামে এক তরুণীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হত্যা ও পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, মৃত্যুর আগে বাবাকে ভিডিও কলে স্বামীর নির্যাতনের কথা জানিয়ে বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছিলেন বর্ষা। অন্যদিকে তাঁর শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় বর্ষার স্বামী নাবিদ হোসাইনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভোরে রাজধানীর মণিপুরীপাড়ার একটি বাসা থেকে বর্ষাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত্যুর আগে বাবার কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন বর্ষা
বর্ষার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) গভীর রাতে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়ে বাবাকে ভিডিও কল করেছিলেন তিনি। এ সময় বর্ষার মুখে রক্তের চিহ্ন দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। ভিডিও কলে তিনি বাবার কাছে সাহায্য চান। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
খবর পেয়ে বর্ষার মা-বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা দ্রুত মণিপুরীপাড়ার বাসায় পৌঁছান। সেখানে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, বর্ষাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পরে হাসপাতালে পৌঁছে তাঁর মৃত্যুর খবর পান তাঁরা।
বর্ষার পরিবার এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মানতে নারাজ। তাঁদের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে যৌতুকের দাবিতে স্বামী নাবিদ হোসাইন তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন।
পরিবারের ভাষ্য, ব্যবসা ও মোটরসাইকেল কেনার কথা বলে বর্ষার শ্বশুরবাড়ি থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকা নেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
আত্মহত্যার দাবি স্বামীর স্বজনদের
অন্যদিকে নাবিদের চাচাতো ভাই শাওনের দাবি, পারিবারিক একটি জন্মদিনের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বর্ষা ও নাবিদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। এ ঘটনার পর বর্ষা একটি কক্ষে নিজেকে আটকে ফেলেন। পরে নাবিদ দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তাঁকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান বলে দাবি করেন তিনি।
তবে বর্ষার পরিবারের সদস্যরা এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বর্ষাকে নির্যাতন করার পর তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে আঘাতের চিহ্ন
মৃত্যুর পর প্রস্তুত করা সুরতহাল প্রতিবেদনে বর্ষার শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্নের উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনে তাঁর গলার ডান পাশে অর্ধচন্দ্রাকৃতির দাগ, দুই চোখের চারপাশে ফোলা ভাব, ডান চোখের ওপর কাটা দাগ এবং ডান হাতের দুটি আঙুলের ডগায় কালচে দাগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধের কারণে মৃত্যুর সন্দেহের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তসহ তদন্তের চূড়ান্ত ফল গুরুত্বপূর্ণ।
তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, বর্ষার বাবা এ ঘটনায় মামলা করেছেন। তাঁর স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পুলিশ ঘটনার সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করছে।
এদিকে বর্ষার মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংগঠনটি ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
