বিন্যান্সে ৬.৩ বিলিয়ন ডলারের সাইবার হামলা, তিন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ

৫ মিনিটে পড়ুন৩ বার পড়া হয়েছে

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনায় প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সহযোগিতায় প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারণা, এ হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গোষ্ঠী জড়িত থাকতে পারে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সংঘটিত এ হামলার বিষয়ে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার বড় অংশ মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে সংঘটিত হয়। হামলাকারীরা বিন্যান্সের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ইন্টারনেট-সংযুক্ত ক্রিপ্টো ওয়ালেট থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ সরিয়ে নেয়।

বিন্যান্সের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির একজন ডেভঅপস প্রকৌশলীর ল্যাপটপের নিরাপত্তা ভেঙে হামলাকারীরা একটি সার্ভিস কনটেইনারে প্রবেশের সুযোগ পায়। এর মাধ্যমে তারা অননুমোদিত লেনদেনের নির্দেশ পাঠাতে সক্ষম হয়। তবে পরবর্তী তদন্তে নিরাপত্তা ভাঙার আরও কয়েকটি সম্ভাব্য পথ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিন্যান্স বলেছে, এখন পর্যন্ত তাদের ওয়ালেটের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চাবি বা প্রাইভেট কি ফাঁস হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত প্রযুক্তিগত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ

বিন্যান্সের তথ্য অনুযায়ী, ব্লকচেইন অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অন-চেইনে জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে স্থিতিশীল ক্রিপ্টোকারেন্সি বা স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার প্রায় ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার এবং সার্কেল ৮০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সম্পদ জব্দ করেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

তবে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের বাকি অংশের অবস্থান সম্পর্কে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। বিন্যান্স জানিয়েছে, সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারের কাজ চলমান রয়েছে এবং ক্ষতির পরিমাণের হিসাব আরও পরিবর্তিত হতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে এবং হামলার কারণে হওয়া সব ক্ষতি তারা নিজেদের অর্থ ও সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজারস (SAFU) থেকে পূরণ করবে। এ ঘটনায় নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য সাময়িকভাবে উত্তোলনসেবা স্থগিত করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ বিবৃতি অনুযায়ী, আমানত বা ডিপোজিট কার্যক্রম চালু রয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস (TRM Labs) জানিয়েছে, তাদের মূল্যায়নে এ হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ‘ট্রেডারট্রেইটর’ (TraderTraitor) নামের হ্যাকার ইউনিটের সংশ্লিষ্টতার উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে। আরেক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসও (Chainalysis) একই ধরনের মূল্যায়ন করেছে।

টিআরএম ল্যাবসের হিসাবে, হামলাকারীরা ১০টি ব্লকচেইনে বিন্যান্সের ওয়ালেট থেকে প্রায় ৬ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ সরিয়ে নেয়। প্রতিষ্ঠানটির মতে, হামলার পদ্ধতির সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্ট বলে আগে চিহ্নিত কয়েকটি বড় ক্রিপ্টো চুরির ঘটনার মিল রয়েছে।

তবে হামলার জন্য উত্তর কোরিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করেনি বিন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, অপরাধীদের পরিচয় শনাক্ত ও তাদের বিচারের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইও জানিয়েছে, তারা ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করছে।

ক্রিপ্টো বাজারেও প্রভাব

হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বৈশ্বিক ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে দরপতন দেখা যায়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বিটকয়েনের দাম একপর্যায়ে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে পৌঁছায়। ইথারের দামও ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামে। বিন্যান্সের নিজস্ব ক্রিপ্টো টোকেন বিএনবির (BNB) দাম ২৪ ঘণ্টায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ কমেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলোতে ডিজিটাল সম্পদ সংরক্ষণের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ সম্পদ নিয়ন্ত্রণকারী প্ল্যাটফর্মগুলোর লেনদেন অনুমোদন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিন্যান্স জানিয়েছে, নিরাপত্তা যাচাই ও সেবা পুনর্বিন্যাসের কাজ শেষ হলে উত্তোলনসেবা স্বাভাবিক করা হবে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর ঘটনার বিস্তারিত প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যাও প্রকাশ করার কথা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।