তিন মাসে বিএসএফের গুলিতে ৪ বাংলাদেশি নিহত, মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—তিন মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে চার বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে সীমান্তে হামলায় ছয়জন আহত এবং ভারত থেকে ২৯ জন বাংলাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক সহিংসতায় ২৭ জন নিহত, ১ হাজার ৯০ জন আহত এবং ২২৩ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ত্রৈমাসিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা, রাজনৈতিক সংঘাত, সীমান্ত পরিস্থিতি, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।
সীমান্তে হত্যা, পুশইন ও নৌকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ
অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ এবং ফেনী সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে প্রাণহানি ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক সীমান্তনীতি ও শরণার্থী সুরক্ষার নীতি লঙ্ঘন করে ভারত থেকে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ ২৯ জন বাংলাভাষী মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া ও সিমেন্টের খুঁটি নির্মাণের চেষ্টা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বালু ও পাথর উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত চারটি নৌকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
সীমান্তে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শরণার্থী সুরক্ষার নীতির পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
রাজনৈতিক সহিংসতায় ২৭ নিহত, আহত ১ হাজার ৯০
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ২৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ৯০ জন আহত হয়েছেন। দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষকে এসব ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৪৫টি সংঘর্ষের ঘটনায় চারজন নিহত ও ৪৮০ জন আহত হয়েছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ এবং গণঅধিকার পরিষদের একটি সংঘর্ষের ঘটনায় যথাক্রমে সাতজন ও ছয়জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলা, বাধা এবং বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
২২৩ নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ২২৩ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে অধিকার। তাঁদের মধ্যে ১৫০ জন কন্যাশিশু এবং ৭৩ জন নারী।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৪ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৩ জন নারী এবং ২১ জন কন্যাশিশু। ধর্ষণের পর ১০ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
এ ছাড়া যৌতুকসংক্রান্ত সহিংসতায় ২৬ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আটজনকে হত্যা এবং চারজন আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিসংখ্যানে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, যৌন সহিংসতা এবং পারিবারিক নির্যাতনের বিষয়গুলো বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
সাংবাদিকদের ওপর ৮৮টি হামলার অভিযোগ
তিন মাসে সাংবাদিকদের ওপর অন্তত ৮৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি। প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে ৫৬ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে আক্রান্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনের বিস্তারিত অংশে একজন সাংবাদিক নির্যাতিত, ২২ জন আহত, ১৩ জন লাঞ্ছিত এবং ১৬ জন হুমকির শিকার হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। এসব হামলার সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া পাসপোর্ট ও টিকিট থাকা সত্ত্বেও তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বিদেশযাত্রায় বাধা দিয়েছে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। একে সংবিধানে বর্ণিত অবাধ চলাচলের অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে দেখেছে তারা।
কারাগারে ৩০ বন্দির মৃত্যু, ২২ জন নিহত গণপিটুনিতে
অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৩০ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৯ জন অসুস্থতাজনিত কারণে এবং একজন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
একই সময়ে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও ব্যক্তিগত বিরোধসহ বিভিন্ন অভিযোগে গণপিটুনির ঘটনায় ২২ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া নিম্ন আদালতে ৮৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে আশুলিয়ার প্রীতি গ্রুপের একটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে সাতজন নিহত ও ১৫ জন আহত এবং সীতাকুণ্ডের একটি শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে নয়জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে অধিকার-এর উদ্বেগ
প্রতিবেদনে নতুন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬ এবং সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন-২০২৬-এর খসড়া তৈরির বিষয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়ায় আন্তর্জাতিক প্যারিস নীতিমালা অনুসরণ না করার কারণে কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে অধিকার কয়েকটি সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গুমের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা বন্ধে সরকারের কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ের বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
