সংবিধান সংস্কারে লংমার্চ নয়, বিরোধীদের সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আসার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
সর্বশেষ হালনাগাদ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৬ অপরাহ্ন
সংবিধান সংস্কারের দাবিতে লংমার্চ কর্মসূচি না করে বিরোধী দলগুলোকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে এসে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদের যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, সেগুলো পরিবর্তন বা শিথিল করতে হলে আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানে আসতে হবে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শীর্ষক সেমিনার সিরিজের প্রথম পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংস্কার লংমার্চের মাধ্যমে হবে না। এ জন্য বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আসতে হবে। যেখানে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া হয়েছিল, সেসব বিষয়ে পরিবর্তন আনতে হলে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় অংশ নিতে হবে। এ ধরনের বিষয় রাজপথের কর্মসূচির পরিবর্তে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিয়ে বক্তব্য
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদের সরাসরি কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তবে সনদটি ঘিরে রাজনৈতিক সমঝোতার গুরুত্ব আইনি ভিত্তির চেয়েও বেশি।
তিনি বলেন, সনদটি জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন কি না এবং এর আইনি স্বীকৃতি কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার শেষ পর্যায়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তখন বিষয়টিকে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভবিষ্যতে দেশে যেন আর কোনো স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা স্বৈরশাসকের উত্থান না ঘটে, সে জন্য সাংবিধানিক সংস্কার প্রয়োজন। এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয় এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে।
এ জন্য সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দিতে এসব প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর পাহারাদার বা ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে কাজ করতে হবে।
বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক পক্ষের সহযোগিতা চেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঐকমত্য ও সমঝোতার ভিত্তিতে সাংবিধানিক সংশোধন করা গেলে তা দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক হবে।
উচ্চকক্ষ নিয়ে আসিফ নজরুলের প্রস্তাব
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করা হলে সেখানে প্রতিনিধিত্ব আনুপাতিক পদ্ধতিতে নির্ধারণ করা উচিত।
উচ্চকক্ষের সদস্যদের বেতন, গাড়ি ও বাসস্থানের মতো রাষ্ট্রীয় সুবিধা না দেওয়ারও প্রস্তাব দেন তিনি। তাঁর মতে, এসব সুযোগ-সুবিধা না থাকলে প্রকৃত অর্থে দেশের জন্য কাজ করতে আগ্রহী ব্যক্তিরা উচ্চকক্ষে আসতে উৎসাহিত হবেন।
সরকারের প্রতি কয়েকটি সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুপারিশও তুলে ধরেন আসিফ নজরুল। এর মধ্যে রয়েছে সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়া এবং এসব কমিটিকে প্রয়োজনীয় নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তলব করার আইনি ক্ষমতা প্রদান।
উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের জন্য দ্রুত একটি নিরপেক্ষ আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দেন তিনি। প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করে নিম্ন আদালতের অভিজ্ঞ বিচারকদের মধ্য থেকে ৫০ শতাংশ বিচারক নিয়োগের কোটা রাখার কথাও বলেন।
এ ছাড়া ‘সানরাইজ ক্লজ’ বা ‘ম্যান্ডেটরি রিভিউ ক্লজ’ ব্যবহারের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ধাপে ধাপে সুপ্রিম কোর্টের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তাব দেন সাবেক এই আইন উপদেষ্টা। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
বাকশাল ও চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে আলোচনা
সেমিনারে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সাংবিধানিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে বাকশাল ও সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে বক্তব্য দেন আসিফ নজরুল।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে সংসদ ভেঙে দেওয়া, সংসদ সদস্যদের আটক করা এবং বিচারকদের চাকরিচ্যুত করার মতো ব্যাপক ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে চলে যায়। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষমতাও সীমিত করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আসিফ নজরুলের মতে, চতুর্থ সংশোধনী বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের একটি গুরুতর বিপর্যয়। এ ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ভবিষ্যতে যেন আর না ঘটে, সে জন্য সাংবিধানিক কাঠামোয় কার্যকর ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদের সভাপতিত্বে সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমান।
