গরু জবাইয়ের মামলায় গুজরাটে তিনজনের যাবজ্জীবন, রায়ে বেদ-মনুস্মৃতির উদ্ধৃতি

৪ মিনিটে পড়ুন৫ বার পড়া হয়েছে

ভারতের গুজরাটে গরু জবাই এবং মাংস বিক্রির চেষ্টার মামলায় তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায় ঘোষণার সময় গরুর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরতে বেদ, মনুস্মৃতি ও অন্যান্য হিন্দুধর্মীয় গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়েছেন বিচারক। প্রত্যেক আসামিকে মোট ৩ লাখ রুপি জরিমানাও করা হয়েছে।

গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) গুজরাটের গান্ধীনগর জেলার কালোলের একটি দায়রা আদালত এ রায় দেন। অতিরিক্ত দায়রা বিচারক বি আর রাজপুত ৭৬ পৃষ্ঠার রায়ে তিন আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন ওয়াসিম কুরেশি, মহম্মদ রফিক কুরেশি ও আসফাক বেহলিম।

২৭৭ কেজি মাংস উদ্ধারের ঘটনায় মামলা

মামলাটি ২০২৪ সালের ২২ আগস্টের। ওই দিন গান্ধীনগর জেলার জামলা গ্রামের লালাভাই সেনমার বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখান থেকে তিন আসামির কাছ থেকে ২৭৭ কেজি গরুর মাংস উদ্ধার করা হয়। এর আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল ৫৫ হাজার রুপি।

অভিযানে গরু জবাইয়ে ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধারণা করা কিছু সরঞ্জাম এবং মাংস পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত একটি যানবাহনও জব্দ করা হয়। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা মাংস বিক্রির পরিকল্পনা ছিল।

এ ঘটনায় মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিচার শেষে তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করেন আদালত। বাকি আসামিদের মধ্যে দুজনকে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে খালাস দেওয়া হয় এবং একজন বিচার চলাকালে মারা যান।

রায়ে বেদ ও মনুস্মৃতির উদ্ধৃতি

৭৬ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারক হিন্দুধর্মীয় ঐতিহ্যে গরুর অবস্থান ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে বেদ, মনুস্মৃতি এবং অন্যান্য প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থের উল্লেখ করেন।

বিচারক বেদের উদ্ধৃতি দিয়ে গরুকে ‘বিশ্বের মাতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, মানবজীবন ও সমাজে গরুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গরু রক্ষাকে ধর্ম ও করুণার সঙ্গে সম্পর্কিত বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।

মনুস্মৃতির প্রসঙ্গ টেনে বিচারক হিন্দু ঐতিহ্যে গরুর পবিত্র অবস্থান এবং গবাদিপশু রক্ষার দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন। ঋগ্বেদের ‘অঘন্যা’ শব্দের উল্লেখ করে গরুকে হত্যা করা উচিত নয়—এমন ধর্মীয় ব্যাখ্যাও রায়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বিচারকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গরুর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব জানা সত্ত্বেও অভিযুক্তরা সেটি জবাই করে মাংস বিক্রির চেষ্টা করেছেন। আইন অনুযায়ী উপযুক্ত শাস্তি না দেওয়া হলে ভবিষ্যতে গরুর অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রত্যেকের জরিমানা ৩ লাখ রুপি

গুজরাট প্রাণী সংরক্ষণ আইন, ১৯৫৪-এর ২০১৭ সালের সংশোধিত বিধানের আওতায় আসামিদের সাজা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ আইনের অধীনেও তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুজরাট প্রাণী সংরক্ষণ আইনের ৮(২) ধারায় প্রত্যেককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ২ লাখ রুপি জরিমানা করা হয়েছে। একই আইনের ৮(৪) ধারায় প্রত্যেককে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং আরও ১ লাখ রুপি জরিমানা দেওয়া হয়েছে। তবে কারাদণ্ডের সাজাগুলো একসঙ্গে কার্যকর হবে। ফলে প্রত্যেকের মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ রুপি।

গুজরাটে ২০১৭ সালের সংশোধনের মাধ্যমে গরু জবাইয়ের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়। রাজ্যটিতে গরু জবাইয়ের পাশাপাশি গরুর মাংস বিক্রি, কেনা, সংরক্ষণ ও পরিবহনের ক্ষেত্রেও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।

আসামিপক্ষের আপত্তি খারিজ

বিচার চলাকালে আসামিপক্ষ উদ্ধার করা মাংসের নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা সরঞ্জামের ফরেনসিক পরীক্ষা না করা এবং মাংসের ওজন নির্ধারণে অসংগতির বিষয়ও আদালতে তুলে ধরা হয়।

তবে আদালত এসব যুক্তি নাকচ করে প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণে তিন আসামির অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন।

সাজা ঘোষণার সময় আসামিপক্ষ তাঁদের পারিবারিক আর্থিক দায়িত্ব এবং পূর্বে অপরাধের রেকর্ড না থাকার বিষয় উল্লেখ করে তুলনামূলক কম শাস্তির আবেদন জানায়। আদালত সেই আবেদনও গ্রহণ করেননি।

রায়ের পর গুজরাটের উপমুখ্যমন্ত্রী হর্ষ সাংভি আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। তাঁর বক্তব্য, গরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে রাজ্যের আইন অমান্যকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।