বারে প্রেমিকার সঙ্গে মদ্যপান ও বিরোধের পর টঙ্গীতে যাত্রা, পরদিন তুরাগে মিলল তাহসিফের মরদেহ — শেষ সাত ঘণ্টায় কী ঘটেছিল?

১৬ মিনিটে পড়ুন৫ বার পড়া হয়েছে

উত্তরার বাসা থেকে বন্ধুর সঙ্গে বের হয়েছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন, বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসবেন। কিন্তু সেই ফেরা আর হয়নি। পরদিন বিকেলে রাজধানীর উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর মরদেহ। মৃত্যুর আগে প্রায় সাত ঘণ্টা তিনি কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে কী ঘটেছিল এবং কীভাবে নদে গেলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা।

তদন্তে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর আগের রাতে তাহসিফ তাঁর কথিত বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশা ও বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁ ও বারে সময় কাটান। সেখানে দিশার সঙ্গে অন্য এক যুবকের কথিত মাদক গ্রহণ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ হয় বলে তদন্ত কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন দীপ। পরে দিশাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তিসংলগ্ন একটি মাঠে যান তাহসিফ।

দীপের দাবি, সেখানে মাদক সংগ্রহ ও সেবনের একপর্যায়ে পুলিশের টহল দল উপস্থিত হলে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। তিনি একটি সেতুর পিলারের পাশে আশ্রয় নেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তবে তিনি নিজে তাহসিফকে পানিতে পড়তে দেখেননি। অন্যদিকে, ঘটনার রাতেই মাকে পাঠানো তাহসিফের শেষ ভয়েস বার্তা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং দীপের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে অসংগতি থাকায় মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।

বাসা থেকে বের হওয়ার পর কোথায় গিয়েছিলেন তাহসিফ?

গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি ভবনে পরিবারের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন তাহসিফ। সন্ধ্যায় তাঁর বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ বাসার নিচে আসেন।

সিসিটিভি ফুটেজের বর্ণনা অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে দীপ মোটরসাইকেল নিয়ে ভবনের গ্যারেজে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর তাহসিফ নিচে নেমে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে দুজনকে পৃথক মোটরসাইকেলে ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বের হওয়ার আগে তাহসিফ মাকে জানিয়েছিলেন, দীপের সঙ্গে কিছু কথা বলে ফিরে আসবেন। পরিবারের কেউ তখন ধারণা করেননি, এটিই হবে তাঁর শেষবারের মতো বাসা থেকে বের হওয়া।

তদন্তের শুরুতে দীপের বক্তব্য ছিল, তাহসিফের মোটরসাইকেলের সমস্যা হওয়ায় তাঁরা একটি ওয়ার্কশপে গিয়েছিলেন। সেখানে মোটরসাইকেল মেরামত ও তেল পরিবর্তন করা হয়। কোনো কোনো বক্তব্যে শপিংমলে যাওয়ার কথাও উঠে আসে। এরপর উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খাওয়ার কথা জানান তিনি।

একপর্যায়ে দীপ দাবি করেন, উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তদন্তকারীদের কাছে দেওয়া বক্তব্যে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার কথা স্বীকার করেন তিনি।

তদন্তে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে তাঁর এসব বক্তব্যের মিল না থাকায় সন্দেহ তৈরি হয়। পরে পিবিআই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়।

দিশার সঙ্গে প্রায় এক বছরের সম্পর্ক

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, তাহসিফ ও জেরিকা তাসনিম দিশার মধ্যে প্রায় এক বছর ধরে সম্পর্ক ছিল। দুজনের বাসাই উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে। তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা প্রায়ই বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও বারে যেতেন। ঘটনার আগের কয়েক দিনও তাঁদের একাধিকবার একসঙ্গে দেখা যায়।

উত্তরার নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারের ব্যবস্থাপকের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার আগের তিন দিনও তাহসিফ একই তরুণীকে নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে দীপসহ অন্য ব্যক্তিরাও ছিলেন। সেখানে তাঁরা গান শুনেছেন, নাচ করেছেন এবং সময় কাটিয়েছেন।

তবে ২৭ অক্টোবরের ঘটনাটি আগের দিনগুলোর তুলনায় ভিন্ন ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

দীপের জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার কয়েক দিন আগে দিশা অন্য এক যুবকের বাসায় গিয়ে ইয়াবা সেবন করেছিলেন। ওই যুবকের সঙ্গে তাঁর শারীরিক সম্পর্কও হয়েছিল বলে তাহসিফ জানতে পারেন। বিষয়টি জানার পর তিনি মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েন।

তবে দিশার বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও অন্য যুবকের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ এখনো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়। এটি দীপের দেওয়া বক্তব্যের অংশ। দিশার নিজস্ব বক্তব্য এবং তদন্তে পাওয়া প্রমাণের সঙ্গে বিষয়টি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নেস্ট বারে তিনজন, বিষণ্ন সংগীত ও বিরোধ

সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তাহসিফ ও দিশাকে উত্তরার নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরা অবস্থায় সেখানে পৌঁছান দীপ। পরে তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন।

প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাঁদের প্রতিষ্ঠানটি থেকে বের হতে দেখা যায়।

দীপ তদন্ত কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, বারে প্রবেশের পর তাহসিফ কর্তৃপক্ষকে বিষণ্ন ধরনের গান বাজানোর অনুরোধ করেন। পরে তিনজনই মদ্যপান করেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ওই রাতে তাহসিফ ১৬ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত চারটি ‘আল্ট্রা স্ট্রং’ বিয়ার পান করেছিলেন। যদিও তাঁর মধ্যে দৃশ্যমান নেশার লক্ষণ ছিল না বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

এ সময় দিশার সঙ্গে অন্য এক যুবকের কথিত সম্পর্ক ও ইয়াবা সেবনের বিষয়টি নিয়ে তাহসিফ প্রশ্ন করতে থাকেন। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।

দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, তাহসিফ দিশাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তুমি তো ইয়াবা খেয়েছ, আমি এর চেয়েও বড় কিছু খাব। আমি হেরোইন খাব।’

তদন্তকারীদের ধারণা, দিশার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ওই রাতের ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বারে তাঁদের মধ্যে ঠিক কী কথা হয়েছিল এবং বিরোধের প্রকৃত কারণ কী ছিল, তা নিশ্চিত হতে দিশার বক্তব্যের সঙ্গে দীপের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

দিশাকে বাসায় পৌঁছে টঙ্গীর পথে

রাত ১২টার দিকে তিনজন নেস্ট বার থেকে বের হন। দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাহসিফ নিজের মোটরসাইকেলে দিশাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেন। দীপও নিজের মোটরসাইকেলে সেখানে যান।

দিশাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ পৃথক মোটরসাইকেলে টঙ্গী বাজারের হাজী মাজার বস্তিসংলগ্ন একটি মাঠের উদ্দেশে রওনা হন।

কেন তাঁরা গভীর রাতে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন, সেটি এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

দীপের দাবি, সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাহসিফ নিজেই নিয়েছিলেন। মাঠের পাশের বস্তির কাছে একটি দোকানের সামনে তাঁরা মোটরসাইকেল পার্ক করেন। পরে সরু গলি দিয়ে মাঠের দিকে যান।

দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, মাঠে তখন অনেক লোকজন উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের বেশির ভাগই স্থানীয় মাদকসেবী ও মাদক কারবারি।

সেখানে গিয়ে তাহসিফ উচ্চস্বরে বলতে থাকেন, কার কাছে হেরোইন আছে, নিয়ে আসতে। যত টাকা প্রয়োজন, দেবেন বলেও জানান তিনি। পরে স্থানীয় কয়েকজনের কাছ থেকে হেরোইন সংগ্রহ করে সেবন করেন বলে দীপ দাবি করেছেন।

দীপ আরও জানিয়েছেন, বারে মদ্যপানের পর মাঠে মাদক সেবন করায় তাহসিফ নিজের ওপর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন।

তবে তাহসিফ সত্যিই হেরোইন সেবন করেছিলেন কি না, তা এখনো পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়নি। তাঁর রক্ত, পাকস্থলী, কিডনি ও ভিসেরার নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

পুলিশের টহল, দৌড়াদৌড়ি ও ২৯ নম্বর পিলারের ঘটনা

দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, মাঠে তাহসিফ যখন মাদক সেবন করছিলেন, তখন পুলিশের একটি টহল দল সেখানে উপস্থিত হয়। পুলিশকে দেখে স্থানীয় মাদক কারবারিরা বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যান। দীপও সেখান থেকে দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে চলে যান।

তিনি তুরাগ নদসংলগ্ন ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে গিয়ে আশ্রয় নেন।

তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে দীপ জানিয়েছেন, দুই থেকে তিন মিনিট পর দুই পুলিশ সদস্য তাঁকে সেখানে দেখতে পান। তাঁরা তাঁর নাম-পরিচয় ও ঠিকানা জানতে চান।

জবাবে তিনি নিজের পরিচয় ও মোহাম্মদপুরের বাসার ঠিকানা জানান। পুলিশ সদস্যরা তাঁর কাছে জানতে চান, মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা হয়ে এত রাতে তিনি টঙ্গীতে কেন এসেছেন।

দীপ তখন নিজেকে ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর দাবি, বিভিন্ন সময় ট্রাফিক পুলিশের মুখোমুখি হলেও তিনি নিজেকে বাহিনীর ক্যাপ্টেন পরিচয় দিতেন। সেদিনও পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে একই পরিচয় ব্যবহার করেন।

পুলিশ সদস্যরা তাঁকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে তিনি তাঁদের পেছনের পথ ব্যবহার না করে বস্তির ভেতরের একটি সরু রাস্তা দিয়ে চলে যান।

দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই এলাকার রাস্তা তাঁর পরিচিত ছিল না। পরে একজন স্থানীয় ব্যক্তির সহায়তায় মূল সড়কে পৌঁছে নিজের মোটরসাইকেলের কাছে ফিরে যান।

এদিকে দীপ দাবি করেছেন, পুলিশের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার সময় তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেননি। তাঁর বক্তব্যের এই অংশটি এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

দীপের বক্তব্যে অসংগতি, তদন্তকারীদের একাধিক প্রশ্ন

তাহসিফের মৃত্যুর তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে দীপের বক্তব্যের পরিবর্তন।

প্রথমদিকে তিনি তাহসিফের সঙ্গে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে যাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। পরে ওই এলাকায় যাওয়ার কথা স্বীকার করেন। কখনো বলেছেন, পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তাঁরা আলাদা হয়ে যান; আবার কখনো বলেছেন, তাহসিফ নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলে তিনি শুনেছেন বা ধারণা করেছেন। তবে তাঁকে নিজ চোখে পানিতে পড়তে দেখেননি বলেও জানিয়েছেন।

দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাহসিফকে একাধিকবার ফোন করেন। কিন্তু প্রতিবারই ফোন বন্ধ পান।

তাঁর ধারণা হয়েছিল, তাহসিফ হয়তো কোথাও বসে মাদক সেবন করছেন। এর আগে তাহসিফ তাঁর কাছ থেকে ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য একটি পাওয়ার ব্যাংক নিয়েছিলেন। ফলে ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণেও সেটি বন্ধ থাকতে পারে বলে মনে করেছিলেন তিনি।

তবে সিসিটিভি ফুটেজের সময় এবং তাহসিফের শেষ ভয়েস বার্তার সঙ্গে দীপের বর্ণনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি সামনে এসেছে।

দৈনিক মানবজমিনের ২ নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে দীপকে মাঠ এলাকা থেকে একা বের হতে দেখা যায়। অন্যদিকে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তাঁর মায়ের মোবাইলে ভয়েস বার্তা পাঠিয়ে জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন।

যদি দীপের দাবি অনুযায়ী, পুলিশের উপস্থিতিতে তাহসিফ তখনই নদে ঝাঁপ দিয়ে থাকেন, তাহলে এর আগে বা পরে মাকে পাঠানো ভয়েস বার্তার সঙ্গে ঘটনাক্রম কীভাবে মিলে যায়, সেটি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

তদন্তকারীরা এসব তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং মোবাইল ফোনের ডিজিটাল আলামত মিলিয়ে দেখছেন।

মায়ের কাছে শেষ ভয়েস মেসেজ, তারপর নিখোঁজ

তাহসিফ বাসায় না ফেরায় তাঁর মা বারবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ মেসেঞ্জারে মায়ের কাছে একটি ভয়েস বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি জানান, রওনা হয়েছেন এবং বাসায় ফিরছেন।

কিন্তু এরপর আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তাহসিফের বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম জানিয়েছেন, রাতে ছেলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন পরিবারের সদস্যরা। বারবার ফোন করেও তাঁকে পাওয়া যাচ্ছিল না।

পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে ছেলের খোঁজে তুরাগ থানায় যান তিনি। পরে বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে উত্তরখান থানার পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয়, তুরাগ নদ থেকে একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যার পরিচয় তাহসিফ।

বিকেল সাড়ে চারটার দিকে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উদ্ধার হলো মোটরসাইকেল, তদন্তে নতুন সূত্র

তাহসিফ বাসা থেকে বের হওয়ার সময় নিজের সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেলটি নিয়ে গিয়েছিলেন। নিখোঁজ হওয়ার পর সেটিরও কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না।

পরে দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকা থেকে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে তদন্তকারীরা। মোটরসাইকেলটি নম্বরপ্লেটবিহীন অবস্থায় পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোটরসাইকেলটি ওই এলাকায় কীভাবে এবং কেন রাখা হয়েছিল, তা তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া উত্তরার বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার ছাড়াও তাহসিফ ও দিশার যাতায়াতের বিষয়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ফুটেজ এবং মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করছেন তদন্তকারীরা।

বাবার দাবি, প্রশিক্ষিত সাঁতারু ছিলেন তাহসিফ

তাহসিফের মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের সন্দেহের অন্যতম কারণ হলো, তিনি প্রশিক্ষিত সাঁতারু ছিলেন।

তাঁর বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ছেলে সাঁতারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। তাই নদে ঝাঁপ দিয়ে ডুবে মারা যাওয়ার বিষয়টি তিনি সহজে মেনে নিতে পারছেন না।

তাঁর প্রশ্ন, একজন প্রশিক্ষিত সাঁতারু কেন নদে পড়ে মারা যাবেন এবং কে বা কারা তাঁকে ধাওয়া করেছিল?

তাহসিফের বাবা আরও জানিয়েছেন, ছেলেকে হত্যা করে মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে নদে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে তাঁদের সন্দেহ। এ ঘটনায় তিনি অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা করেছেন।

তবে পরিবারের অভিযোগ এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এখনো মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।

ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার অপেক্ষা

তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের পাশাপাশি রাসায়নিক পরীক্ষার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ফরেনসিক বিভাগের প্রাথমিক ধারণা, পানিতে ডুবে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্ত এবং রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

মৃত্যুর আগে তিনি অ্যালকোহল, হেরোইন বা অন্য কোনো নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা জানতে রক্ত, পাকস্থলী, কিডনি ও ভিসেরার নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ডিএনএ পরীক্ষার নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে।

ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, মরদেহটি আনুমানিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। তবে পানিতে পড়ার সময় তাঁর শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল, কীভাবে তিনি সেখানে পৌঁছেছিলেন এবং মৃত্যুর আগে অন্য কোনো আঘাত পেয়েছিলেন কি না—এসব বিষয়ও তদন্তে বিবেচনা করা হচ্ছে।

দিশা ও দীপ দুজনই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার, চার দিনের রিমান্ড

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বাবার করা মামলার তদন্তে প্রথমে বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই। পরে তাঁকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হলে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।

অন্যদিকে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাহসিফের সঙ্গে বারে দেখা যাওয়া তরুণী জেরিকা তাসনিম দিশাকে শনাক্ত করে পুলিশ।

গত ৩১ অক্টোবর রাতে রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১ নভেম্বর আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত তাঁরও চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দিশার সঙ্গে তাহসিফের যোগাযোগ, ঘটনার দিন তাঁদের একসঙ্গে অবস্থান এবং দীপের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়গুলো যাচাই করা প্রয়োজন।

তদন্তে দুইজনের বক্তব্যের মধ্যে মিল-অমিল খুঁজে বের করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঘটনার রাতে বারে কী হয়েছিল, দিশাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ কোথায় গিয়েছিলেন এবং টঙ্গীর মাজার বস্তিতে তাঁদের সঙ্গে আর কারা ছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

তিনটি স্থান, অসংখ্য প্রশ্ন

তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য উদ্‌ঘাটনে তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তিনটি স্থান—উত্তরার নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার, টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠ এবং তুরাগ নদ।

প্রথম স্থানে তাহসিফ, দিশা ও দীপের উপস্থিতি সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় স্থানে তাহসিফ ও দীপের যাতায়াতের তথ্য এবং মোটরসাইকেল উদ্ধারের ঘটনা তদন্তে এসেছে। তৃতীয় স্থান থেকে উদ্ধার হয়েছে তাহসিফের মরদেহ।

তবে বারে তাঁদের মধ্যে ঠিক কী ঘটেছিল, টঙ্গীর মাঠে কারা উপস্থিত ছিলেন, পুলিশের টহল দলের সঙ্গে তাঁদের কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে তাহসিফ নদে পড়েছিলেন—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো মেলেনি।

২ নভেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীপ ও দিশাকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তাঁদের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল মিলিয়ে মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা করছে তদন্তকারী সংস্থা।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।