পোশাকশিল্পে অস্থিরতার পেছনে সাবেক এমপি-মন্ত্রী ও কিছু শিল্পমালিক: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৬ মিনিটে পড়ুন৪ বার পড়া হয়েছে

তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংসতার পেছনে কয়েকজন শিল্পমালিক, সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর দাবি, রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট কিছু শিল্পমালিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কারখানা বন্ধ রেখে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোকে শনাক্ত করতে পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠনগুলোর কাছে তালিকা চেয়েছে সরকার।

সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক দিন ধরে একটি পতিত স্বৈরাচারী শক্তির সমর্থক কিছু পক্ষ শ্রমিকদের ব্যবহার করে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ এবং সহিংসতার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে যারা ইন্ধন দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, কিছু শিল্পমালিকের রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ সাবেক সংসদ সদস্য, কেউ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এসব ব্যক্তির কেউ কেউ চলমান অস্থিরতার পেছনে কাজ করছেন বলে সরকারের কাছে তথ্য ও প্রমাণ রয়েছে।

কারখানা বন্ধে মালিকদের তালিকা চেয়েছে সরকার

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু শিল্পমালিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কারখানা বন্ধ রেখেছেন। তাঁদের শনাক্ত করতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের কাছে তালিকা চাওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনের ব্যানার ব্যবহার করে অস্থিরতা তৈরিতে জড়িত শ্রমিকনেতা ও সংগঠনগুলোর তথ্যও চেয়েছে সরকার। সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, অডিও রেকর্ডিং এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং দেশের স্থিতিশীলতা নষ্টের চেষ্টায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর দাবি, প্রকৃত শ্রমিকেরা নিজেদের কর্মসংস্থান ধ্বংস করতে চান না; বরং একটি পক্ষ তাঁদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে ভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।

তবে যেসব শিল্পমালিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তাঁদের নাম প্রকাশ করেননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বা সরকারের উল্লেখ করা প্রমাণের বিস্তারিতও সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রকাশ করা হয়নি।

পুলিশ সদর দপ্তরে বিশেষ নিয়ন্ত্রণকক্ষ

শিল্পাঞ্চলে নতুন করে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ২৪ ঘণ্টা নজরদারির ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি জানান, পুলিশ সদর দপ্তরে একটি বিশেষ নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন করা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ বিভাগ এবং বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য পৃথক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ‘সুরক্ষা’ অ্যাপ ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান করা হবে। এর মাধ্যমে কোথাও নতুন করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো শিল্পকারখানা বন্ধ থাকুক, সরকার তা চায় না। শ্রমিকদের জীবিকা ও কর্মসংস্থান রক্ষায় মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে কারখানার কার্যক্রম সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, গাজীপুর ও কালিয়াকৈর এলাকার কিছু কারখানা আগের দিন এক দিনের জন্য বন্ধ থাকলেও সোমবার সেগুলোর কয়েকটি আবার চালু হয়েছে। তবে আর্থিক সংকট, রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া কিংবা নিজস্ব সমস্যার কারণে বন্ধ থাকা কারখানাগুলোকে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বন্ধ কারখানার সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠকের প্রস্তুতি

এদিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে কয়েক দিন ধরে আন্দোলন চলছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার ছয় সদস্যের একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বোর্ডের প্রথম বৈঠক সোমবারই অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে যত দ্রুত সম্ভব নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়সীমা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে সরকারের আগ্রহ রয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সহানুভূতিশীলভাবে মজুরি নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সোমবার বিকেল ৩টায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সকালে মালিকপক্ষের বক্তব্য শোনার পর শ্রমিকনেতাদের মতামত নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের কথা জানান তিনি।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। ফলে শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে চলমান বিরোধের পাশাপাশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকা ও সহিংসতার ঘটনা দেশের রপ্তানি বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।