শিক্ষা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামরিক সেবা আইনের প্রতিবাদে জার্মানিতে জেন-জি আন্দোলন
শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগের ঘাটতি এবং নতুন সামরিক সেবা আইনের বিরোধিতা করে জার্মানির রাজপথে নেমেছে তরুণ প্রজন্ম। ‘জেন-জি রেগেল্ট’ (Gen Z regelt) নামের একটি তরুণনির্ভর উদ্যোগের আহ্বানে গত ৩১ অক্টোবর দেশটির ৩৪টি শহরে বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের দাবি, এসব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ। দিনের বেলায় অধিকাংশ সমাবেশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার পর ফ্রাঙ্কফুর্ট, হামবুর্গ ও কোলনসহ কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ফ্রাঙ্কফুর্টে সংঘর্ষে শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত এবং ৫৪ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
কেন রাজপথে জার্মানির তরুণেরা?
জার্মানির এই আন্দোলনের পেছনে একক কোনো দাবি নেই। শিক্ষা, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, সামরিক নীতি ও পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয়ে তরুণদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ একত্র হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ দেশটির শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা। তাঁদের মতে, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো জরাজীর্ণ, শিক্ষকসংকট রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও সুযোগ-সুবিধার অভাব প্রকট। একই সঙ্গে স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
জীবনযাত্রার ব্যয়ও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ। বাড়িভাড়া, আবাসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং দৈনন্দিন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তরুণদের স্বাধীনভাবে জীবন শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তাঁদের অভিযোগ। পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের বোঝা ন্যায্যভাবে বণ্টন, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।
আন্দোলনটির ছয়টি প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিরোধিতা, নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং কার্যকর জলবায়ু সুরক্ষা।
নতুন সামরিক সেবা আইন কেন তরুণদের ক্ষোভের কারণ?
আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জার্মানির নতুন সামরিক সেবা কাঠামো। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দেশটিতে নতুন Wehrdienst আইন কার্যকর হয়েছে। এর মাধ্যমে সামরিক বাহিনীতে জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
আইন অনুযায়ী, ২০২৬ সাল থেকে ১৮ বছর বয়সী জার্মান নাগরিকদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের আগ্রহ ও শারীরিক যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রশ্নপত্র পাঠানো হচ্ছে। পুরুষদের জন্য প্রশ্নপত্র পূরণ বাধ্যতামূলক হলেও নারীদের ক্ষেত্রে এটি স্বেচ্ছামূলক। ২০০৮ সালে বা তার পরে জন্ম নেওয়া পুরুষদের জন্য ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালুর বিধানও রয়েছে।
তবে নতুন আইনে সামরিক বাহিনীতে যোগদান এখনো স্বেচ্ছামূলক রাখা হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবী না পাওয়া গেলে অথবা নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে দেশটির পার্লামেন্ট নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে প্রয়োজনভিত্তিক বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু করতে পারবে।
তরুণদের আপত্তি মূলত সামরিক সেবার এই বাধ্যবাধকতার সম্ভাবনা, বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়ে। তাঁদের বক্তব্য, নিজেদের ভবিষ্যৎ ও জীবনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তরুণদের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দেশব্যাপী আন্দোলন
‘জেন-জি রেগেল্ট’ মূলত তরুণদের একটি দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা উদ্যোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আহ্বান থেকেই আন্দোলনটি দ্রুত পরিচিতি পায়। টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের পাশাপাশি টেলিগ্রামেও আন্দোলনের কর্মসূচি ও প্রচারণা চালানো হয়।
সংগঠনটির নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন শহরের স্থানীয় উদ্যোগের সমন্বয়ে কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে। বার্লিন, কোলন, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও মিউনিখে মূল উদ্যোগটির ভূমিকা ছিল বেশি।
জার্মানির আন্দোলনটি ইউরোপের অন্যান্য দেশের তরুণদের বিক্ষোভ থেকেও অনুপ্রেরণা পেয়েছে। বিশেষ করে ফ্রান্স ও ইতালিতে শিক্ষা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি নীতির প্রতিবাদে চলমান আন্দোলন জার্মানির তরুণদের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে। তবে বিভিন্ন দেশের আন্দোলনগুলো একই কেন্দ্রীয় সংগঠনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে—এমন কোনো তথ্য নেই।
৩১ অক্টোবর কী ঘটেছিল?
শনিবার (৩১ অক্টোবর) জার্মানির ৩৪টি শহরে একযোগে কর্মসূচি পালিত হয়। আয়োজকদের হিসাবে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ এতে অংশ নেন। এর আগে অনলাইন নিবন্ধনে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষের আগ্রহের কথা জানানো হয়েছিল। তবে নিবন্ধনের সংখ্যা ও বাস্তবে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এক ছিল না।
বার্লিনের ব্রান্ডেনবুর্গ গেটে কয়েক হাজার মানুষ সমবেত হন। সেখানে শিক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামরিক সেবার বিরোধিতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে বক্তব্য ও স্লোগান দেন তরুণেরা।
ফ্রাঙ্কফুর্টে পুলিশের হিসাবে প্রায় ৮ হাজার মানুষ সমাবেশে অংশ নেন। দিনের কর্মসূচি বেশির ভাগ সময় শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকজন অংশগ্রহণকারীর মুখ ঢেকে রাখা ও আতশবাজি ব্যবহারের কারণে কয়েক দফা মিছিলের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রধান কেনাকাটার এলাকা জাইল শপিং স্ট্রিটে একদল মুখোশধারী ব্যক্তি দোকানের কাচ ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। অন্তত ১৭টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে পাঁচটিতে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পুলিশের দাবি, সংঘর্ষের সময় পুলিশ ও জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা, পাথর ও বোতল নিক্ষেপ করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রায় ১ হাজার ৩০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। রোববার হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোসেক জানান, সংঘর্ষে শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন এবং ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সী ৫৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৮৭টি ফৌজদারি অভিযোগ নথিভুক্ত, ১ হাজার ২২৫টি স্থানত্যাগের নির্দেশ জারি এবং ৩৬৬ জনকে তল্লাশি করা হয়েছে।
হামবুর্গেও দিনের প্রধান সমাবেশের পর সন্ধ্যায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের আশপাশে একদল ব্যক্তি ব্যারিকেড তৈরি, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের দিকে পাথর এবং আতশবাজি নিক্ষেপ করে। পুলিশ প্রায় ১২০ জনকে আটক করে। এ ঘটনায় ১১ পুলিশ সদস্য আহত হন।
কোলনে পুলিশের নির্দেশে বিকেল ৪টার দিকে মূল সমাবেশের কার্যক্রম শেষ করা হয়। পরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, আতশবাজি নিক্ষেপ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে জলকামান ব্যবহার করা হয়। এ ঘটনায় ২৩ পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
সহিংসতার জন্য কারা দায়ী, শুরু হয়েছে তদন্ত
সহিংসতার ঘটনায় জার্মানির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডব্রিন্ট কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে সহিংস বামপন্থী গোষ্ঠী ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের কিছু ব্যক্তি পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করেছে। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পোসেকও দাবি করেছেন, ফ্রাঙ্কফুর্টের সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। তাঁদের একটি বড় অংশ অভিবাসী পটভূমির বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তবে পুলিশের প্রাথমিক মূল্যায়নে ফ্রাঙ্কফুর্টের সহিংসতায় জড়িত অনেকের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে সহিংসতার সঙ্গে মূল আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পর্ক এবং জড়িত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য এখনো তদন্তের বিষয়।
এদিকে ‘জেন-জি রেগেল্ট’ কর্তৃপক্ষ সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছে। তাদের বক্তব্য, আন্দোলনের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছিল এবং সহিংসতা তাদের দাবির অংশ নয়।
পরবর্তী কর্মসূচি ও সরকারের প্রতিক্রিয়া
আন্দোলনের দাবিগুলোর প্রতি সমর্থন জানিয়ে জার্মানির শিক্ষামন্ত্রী কারিন প্রিয়েন বলেছেন, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানো তরুণদের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে শোনা প্রয়োজন। শিক্ষা খাতে সুযোগের বৈষম্য কমানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন।
আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। ২ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মসূচির আহ্বান জানিয়েছে উদ্যোগটি। জার্মান সংবাদমাধ্যম এমডিআরের ১ নভেম্বর সন্ধ্যার প্রতিবেদনে দেশব্যাপী পরবর্তী বিক্ষোভের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ১৪ নভেম্বরের কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ২০ নভেম্বর আন্তর্জাতিক যুব আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এদিকে ফ্রাঙ্কফুর্টসহ বিভিন্ন শহরের সহিংসতার ঘটনায় পুলিশ তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। ঘটনার ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
