৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে ফের উত্তাল শিল্পাঞ্চল, মিরপুরে মেট্রো স্টেশন বন্ধ

৬ মিনিটে পড়ুন৪ বার পড়া হয়েছে

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর মিরপুর ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। অন্যদিকে, যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশন।

শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

মিরপুরে শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ

মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় পোশাকশ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে তাঁরা বিভিন্ন সড়কে অবরোধ সৃষ্টি করেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে।

এ সময় শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।

মিরপুর এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় মঙ্গলবার সকালে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

গাজীপুরে পুলিশ-বিজিবির সঙ্গে সংঘর্ষ

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় মঙ্গলবার সকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন পোশাকশ্রমিকেরা।

খবর পেয়ে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা মহাসড়ক থেকে অবরোধ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে শ্রমিকদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কয়েক রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। জবাবে শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন।

মঙ্গলবার সকাল ১০টা পর্যন্ত পুরো এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সংঘর্ষের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের উভয় পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। এতে যাত্রী ও পরিবহনচালকদের দুর্ভোগে পড়তে হয়।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেন।

এ সময় কেন্দ্রীয় বিএনপির সহশ্রমবিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খানও উপস্থিত ছিলেন।

সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তবে শিল্পকারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধ করে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা যাবে না। শ্রমিকদের ধৈর্য ধরার এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।

হুমায়ুন কবির খানও শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনার পাশাপাশি শিল্পকারখানা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।

আন্দোলনের প্রভাব ছড়িয়েছে আশপাশের শিল্পাঞ্চলে

শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুধু মিরপুর ও গাজীপুরে সীমাবদ্ধ নেই। সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও আন্দোলন, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

সোমবার (২ নভেম্বর) সাভারের আশুলিয়া ও আশপাশের এলাকায় শ্রমিকদের কর্মবিরতি এবং বিক্ষোভের সময় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কয়েক দফা টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এসব ঘটনায় শিল্প পুলিশের এক সহকারী পুলিশ সুপার, পথচারী ও সাধারণ শ্রমিকসহ অন্তত ২০ জন আহত হন বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, আশুলিয়া-জিলানি ও নারায়ণগঞ্জের ৬৭৯টি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ না করে বেরিয়ে যান।

মজুরি বোর্ড গঠনের পরও থামেনি বিক্ষোভ

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে গত ১ নভেম্বর নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। ছয় সদস্যের এই বোর্ডে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের দুজন করে প্রতিনিধি, একজন সরকারি প্রতিনিধি এবং একজন নিরপেক্ষ সদস্য রয়েছেন। পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পর্যালোচনা করে নতুন মজুরির সুপারিশ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বোর্ডটিকে।

বর্তমানে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালের নভেম্বরে এই মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়।

শ্রমিকদের দাবি, খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, পরিবহনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরিতে পরিবার নিয়ে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে তাঁরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছেন।

তবে মালিকপক্ষের বক্তব্য, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে একবারে এত বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

রপ্তানি খাতেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই শিল্প থেকে।

শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এর আগে সতর্ক করে বলেছেন, কারখানার কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ এবং রপ্তানি আয় দেশে আসার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হতে পারে।

নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত থাকায় দেশের প্রধান পোশাকশিল্প এলাকাগুলোতে উৎপাদন ও যোগাযোগব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার সকালেও ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।