রিয়াদ থেকে তায়েফ—সৌদি আরবেও ছড়িয়ে পড়ছে হ্যালোইন আয়োজন
একসময় সৌদি আরবে প্রকাশ্যে হ্যালোইন উদ্যাপনের কথা ছিল কল্পনার বাইরে। তবে সময়ের সঙ্গে দেশটির বিনোদন ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের পরিবর্তনে এবারও হ্যালোইন উপলক্ষে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে রাজধানী রিয়াদের বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্র, হোটেল ও রেস্তোরাঁ। ভূত, কঙ্কাল, ডাইনি ও বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্রের পোশাক, ভৌতিক সাজসজ্জা, মুখে রং করা, কস্টিউম প্রতিযোগিতা এবং শিশুদের বিশেষ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হয়েছে ৩১ অক্টোবরের হ্যালোইন।
২০২৬ সালের ২৭ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদের বিভিন্ন স্থানে একাধিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি তায়েফ শহরেও হ্যালোইন ঘিরে বিশেষ বিনোদন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তবে এসব অনুষ্ঠানকে পুরো সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় উৎসব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অধিকাংশ আয়োজন হয়েছে নির্দিষ্ট বিনোদনকেন্দ্র, হোটেল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে।
রিয়াদে ভৌতিক সাজে বিনোদন, হরর রুম ও কস্টিউম প্রতিযোগিতা
এবারের হ্যালোইন উপলক্ষে রিয়াদের গ্র্যাভিটি ট্রাম্পোলিন পার্কে ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী বিশেষ আয়োজন করা হয়। এতে ছিল সরাসরি বিনোদনমূলক পরিবেশনা, ভৌতিক অভিজ্ঞতার জন্য আলাদা হরর রুম, মুখে রং করার ব্যবস্থা, শিশুদের ট্রিক অর ট্রিট কার্যক্রম এবং ছবি তোলার বিশেষ জায়গা। পাশাপাশি সেরা পোশাকের জন্য প্রতিযোগিতার ব্যবস্থাও রাখা হয়।
শিশুদের জন্যও ছিল আলাদা আয়োজন। রিয়াদের ফানকোয়েস্টে ২৯ ও ৩০ অক্টোবর দুই দিনব্যাপী হ্যালোইন পার্টির আয়োজন করা হয়। এতে শিশুদের জন্য ট্রিক অর ট্রিট অভিযান, সেরা পোশাকের প্রতিযোগিতা, ফেস পেইন্টিং, বেলুন দিয়ে বিভিন্ন আকৃতি তৈরি এবং নাচ-গানের ব্যবস্থা ছিল।
এ ছাড়া ইন্টারকন্টিনেন্টাল দুররাত আল রিয়াদ হোটেলে ২৯ ও ৩০ অক্টোবর শিশুদের জন্য পাম্পকিন পার্টির আয়োজন করা হয়। নভেম্বরের ৫ ও ৬ তারিখেও একই ধরনের আয়োজনের সূচি রাখা হয়েছিল। এতে শিশুদের পছন্দের বিভিন্ন চরিত্রের পোশাক পরে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
পাঁচ তারকা হোটেল ও রেস্তোরাঁয় হ্যালোইন আয়োজন
রিয়াদের অভিজাত হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতেও হ্যালোইনকে কেন্দ্র করে বিশেষ আয়োজন দেখা গেছে।
দ্য রিটজ-কার্লটন রিয়াদের আল ওরজোয়ান রেস্তোরাঁয় ৩১ অক্টোবর আয়োজন করা হয় ‘হন্টেড ব্রাঞ্চ’। এতে হ্যালোইন থিমের খাবার ও পানীয়ের পাশাপাশি শিশুদের জন্য কুমড়া সাজানো, কাল্পনিক জাদুর পানীয় তৈরির কর্মশালা, মুখে রং করা এবং গুপ্তধন খোঁজার মতো কার্যক্রম রাখা হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৭৫ সৌদি রিয়াল এবং ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ২২৫ রিয়াল।
অন্যদিকে, নোজোমি রেস্তোরাঁয় ২৯ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ‘স্পুকি নাইটস’ নামে বিশেষ আয়োজন চলে। সেখানে হ্যালোইনভিত্তিক সাজসজ্জার পাশাপাশি বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা ছিল।
রিয়াদের চোট্টো মাত্তে রেস্তোরাঁয় আয়োজন করা হয় ‘জোকার্স নাইট’। এতে ডিজে, সংগীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পীদের পরিবেশনা, ফেস পেইন্টিং এবং হ্যালোইন থিমের বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়।
এ ছাড়া কই রেস্তোরাঁয় বিশেষ সুশি বুফে ও পোশাক প্রতিযোগিতা এবং দ্য অ্যালিতে মাস্ক ও বিশেষ পোশাক পরিধান করে অংশ নেওয়ার সুযোগসহ মাস্করেড পার্টির আয়োজন করা হয়।
তায়েফেও অনুষ্ঠিত হয়েছে ভৌতিক উৎসব
শুধু রাজধানী রিয়াদেই নয়, সৌদি আরবের তায়েফ শহরেও হ্যালোইন উপলক্ষে বিশেষ আয়োজনের খবর পাওয়া গেছে।
আরব নিউজের ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত একটি আয়োজনসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তায়েফের গেমস অ্যাভিনিউতে ‘দ্য নাইটস অব হরর’ নামে ২৮ ও ৩১ অক্টোবর বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে ভৌতিক থিমের পানীয়, ডিজে পরিবেশনা এবং সেরা পোশাকের প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা ছিল।
এতে বোঝা যায়, এবারের আয়োজন কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক ছিল না; অন্য শহরেও নির্দিষ্ট বিনোদনকেন্দ্রগুলো এই উৎসবকে ঘিরে কর্মসূচি নিয়েছে।
সৌদি আরবে হ্যালোইনের পরিবর্তিত ইতিহাস
সৌদি আরবে হ্যালোইন উদ্যাপনের বর্তমান চিত্র বুঝতে হলে ২০২২ সালের ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। ওই বছর রিয়াদের বুলেভার্ড এলাকায় ‘স্ক্যারি উইকেন্ড’ নামে দুই দিনব্যাপী ভৌতিক পোশাকের উৎসব আয়োজন করা হয়েছিল। এটি ছিল দেশটির বিনোদন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে আয়োজিত প্রকাশ্য হ্যালোইন-থিমের উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান।
সৌদি গেজেটের ২৪ অক্টোবর ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেনারেল এন্টারটেইনমেন্ট অথরিটি (জিইএ) ঘোষণা করেছিল, যারা ভৌতিক পোশাক পরে বুলেভার্ড সিটিতে আসবেন, তাঁদের বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে।
সৌদি সংবাদমাধ্যম আল-মদিনার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই আয়োজনের প্রথম দিনেই ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি দর্শনার্থী উপস্থিত হয়েছিলেন। পুরো দুই দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা আড়াই লাখ ছাড়িয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল।
এরপর থেকে সৌদি আরবের বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক উৎসব, কস্টিউম পার্টি ও থিমভিত্তিক আয়োজন আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
ভিশন ২০৩০ ও বিনোদন খাতের সম্প্রসারণ
সৌদি আরবের এই পরিবর্তনের পেছনে দেশটির বৃহত্তর বিনোদন ও পর্যটন খাত সম্প্রসারণের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনার আওতায় দেশটিতে পর্যটন, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও বিনোদন খাতে ব্যাপক কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর শুরু হয়েছে রিয়াদ সিজনের সপ্তম আসর। সৌদি প্রেস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, এবারের আয়োজনে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সংগীতানুষ্ঠান, মঞ্চনাটক, কমেডি শো এবং শিশু ও পরিবারের জন্য বিভিন্ন বিনোদনমূলক কর্মসূচি রয়েছে।
এমন পরিবেশে আন্তর্জাতিক উৎসব ও থিমভিত্তিক আয়োজনও দেশটির বাণিজ্যিক বিনোদন খাতের একটি অংশ হয়ে উঠছে।
তবে হ্যালোইন এখনো সৌদি আরবের প্রধান জাতীয় উৎসব বা সরকারি ছুটি নয়। দেশটির বিভিন্ন শহরে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও বিনোদনকেন্দ্রের উদ্যোগে আয়োজন হলেও এর অংশগ্রহণ বা জনপ্রিয়তা সম্পর্কে দেশজুড়ে প্রতিনিধিত্বমূলক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
