৪ নভেম্বর থেকে চার দিন গ্যাসের চাপ কম থাকবে, কমবে জাতীয় সরবরাহ ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট
আগামী ৪ নভেম্বর সকাল থেকে টানা চার দিন দেশে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। কক্সবাজারের মহেশখালীর সামিট এলএনজি টার্মিনালে রক্ষণাবেক্ষণকাজের কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক সরবরাহ ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যাবে। এতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের গ্যাসের স্বল্পচাপজনিত ভোগান্তিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) জানিয়েছে, ৪ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে ৭ নভেম্বর বিকেল ৪টা পর্যন্ত মহেশখালীর সামিট এলএনজি টার্মিনালের পুনর্গ্যাসীকরণ কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এ সময়ে দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ৯২০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসবে।
অর্থাৎ, প্রতিদিন প্রায় ৩২ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমবে। চার ক্যালেন্ডার দিনজুড়ে চলা এই কার্যক্রমের নির্ধারিত সময় মোট ৮০ ঘণ্টা।
কেন বন্ধ হচ্ছে সামিটের এলএনজি টার্মিনাল?
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করা হয় বিদেশ থেকে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মাধ্যমে। আমদানি করা এলএনজি সরাসরি জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করা যায় না। প্রথমে বিশেষায়িত টার্মিনালে তরল গ্যাসকে পুনরায় গ্যাসীয় অবস্থায় রূপান্তর করতে হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় রিগ্যাসিফিকেশন বা পুনর্গ্যাসীকরণ।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে বাংলাদেশের দুটি ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করে সামিট গ্রুপ এবং অন্যটি পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি।
সামিটের টার্মিনালের দৈনিক গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এক্সিলারেটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সব মিলিয়ে দুটি টার্মিনালের দৈনিক সর্বোচ্চ সরবরাহ সক্ষমতা ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
পেট্রোবাংলার ঘোষণা অনুযায়ী, সামিটের টার্মিনালে রক্ষণাবেক্ষণ চলাকালে সেখান থেকে গ্যাস উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বন্ধ থাকবে। অন্যদিকে, এক্সিলারেটের টার্মিনাল চালু থাকবে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকেও গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।
জাতীয় সরবরাহ কমবে প্রায় ১৩ শতাংশ
দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে আগে থেকেই বড় ব্যবধান রয়েছে। দৈনিক প্রায় ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ২৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।
রক্ষণাবেক্ষণ চলাকালে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে প্রায় ২২৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসতে পারে। ফলে মোট জাতীয় গ্যাস সরবরাহ প্রায় ১৩ শতাংশ কমে যাবে।
বর্তমানে দৈনিক চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি প্রায় ১২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। রক্ষণাবেক্ষণকালে তা বেড়ে প্রায় ১৫৭০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে।
অর্থাৎ, সরবরাহ কমার কারণে আগে থেকেই চলমান গ্যাসসংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাবের আশঙ্কা
পেট্রোবাংলার বিজ্ঞপ্তিতে দেশজুড়ে গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের স্বল্পচাপ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের ওপর।
আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে রান্নার চুলায় গ্যাসের চাপ কমে যেতে পারে। কোনো কোনো এলাকায় চুলার আগুন স্বাভাবিকের তুলনায় কম জ্বলতে পারে কিংবা নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাসের ব্যবহার ব্যাহত হতে পারে।
শিল্পকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রমের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব কারখানায় বয়লার, চুল্লি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি গ্যাসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, সেখানে চাপ কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে। দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সিএনজি স্টেশন ও বাণিজ্যিক গ্রাহকেরাও স্বল্পচাপের সমস্যায় পড়তে পারেন।
তবে কোন এলাকায় কতটুকু সরবরাহ কমবে কিংবা কোন খাতে কতটা প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে পেট্রোবাংলা এখন পর্যন্ত বিস্তারিত এলাকাভিত্তিক সময়সূচি প্রকাশ করেনি।
রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে পেট্রোবাংলা ও সামিটের বক্তব্যে পার্থক্য
রক্ষণাবেক্ষণের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পেট্রোবাংলা তাদের ১ নভেম্বরের বিজ্ঞপ্তিতে কাজটিকে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে সামিট এলএনজি টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ ২ নভেম্বর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই রক্ষণাবেক্ষণকাজ জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি; বরং বার্ষিক পরিচালন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, পেট্রোবাংলা ও রাষ্ট্রায়ত্ত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ ধরে সমন্বয় করে রক্ষণাবেক্ষণের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। এলএনজি কার্গো আমদানি, গ্যাস পুনর্গ্যাসীকরণ এবং জাহাজ থেকে জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের কার্যক্রম বিবেচনায় রেখে সময় নির্বাচন করা হয়।
সামিটের দাবি, এলএনজি অবকাঠামোর নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট সময় পর গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। নির্ধারিত সময়ে এ কাজ সম্পন্ন করলে দীর্ঘমেয়াদে টার্মিনালের কার্যক্ষমতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা সম্ভব।
আগেও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছিল
এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও মহেশখালীর সামিট এলএনজি টার্মিনালে একই ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছিল। সে সময়ও জাতীয় গ্যাস সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটেছিল।
এবারের রক্ষণাবেক্ষণের সময়ও দেশের গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। ফলে টার্মিনালটি সাময়িক বন্ধ থাকলে বিদ্যুৎ, শিল্প ও আবাসিক খাতে চলমান সংকট আরও বাড়তে পারে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, ৪ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম ৭ নভেম্বর বিকেল ৪টায় শেষ হওয়ার কথা। সাময়িক অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
