জনগণের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে: জামায়াত আমির
জনগণের অধিকার জনগণের হাতে ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন ও সংগ্রাম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, অতীতের মতো প্রতিবাদী কণ্ঠ দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হলে জনগণ তা মেনে নেবে না। একই সঙ্গে বিরোধী দলের সমালোচনা না করে সরকারকে নিজেদের ব্যর্থতা ও জনদুর্ভোগের সমাধানে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে সদ্য কারামুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সহযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান দেশবাসী ও প্রবাসীদের অধিকারের জন্য যেভাবে লড়াই করে কারাবরণ করেছিলেন, আমরা কথা দিচ্ছি—জনগণের প্রতিটি অধিকার আদায়ের জন্য সমান লড়াই আমরা চালিয়ে যাচ্ছি এবং চালিয়ে যাব। যতদিন পর্যন্ত জনগণের অধিকার জনগণের হাতে ফিরে না যাবে, আমাদের লড়াই ততদিন চলবে।’
সরকারকে রাজনৈতিক বক্তব্যে সতর্কবার্তা
বক্তব্যে বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, সরকারের ব্যর্থতা, অযোগ্যতা ও অদক্ষতা আড়াল করতে বিরোধী দলকে অপপ্রচারের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিরোধী দলের চরিত্রহননের চেষ্টা না করে সরকারের উচিত নিজেদের ব্যর্থতার সমাধান করা। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করতে পারলে জনগণের সমর্থন পাওয়া সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিরোধী দলের প্রতিবাদী কণ্ঠ দমিয়ে রাখার চেষ্টা হলে তা প্রতিহত করার কথা উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, দেশের মানুষ আর ফ্যাসিবাদ মেনে নেবে না। জনগণ সংগঠিতভাবে প্রতিবাদ চালিয়ে যাবে।
সরকারের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘যে সাপ আপনারা নাচাচ্ছেন, ওই সাপই একদিন ছোবল দেবে।’
বিমানবন্দরের অনিয়মের প্রতিবাদে কারাবরণের দাবি আখতারুজ্জামানের
অনুষ্ঠানে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তার ও কারাবাসের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন জামায়াত আমির। তাঁর দাবি, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি ব্যবস্থাপনার অনিয়ম এবং যাত্রীদের ভোগান্তির প্রতিবাদ করায় আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরে ট্রলি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আখতারুজ্জামানের প্রতিবাদের পর দুই দফায় নতুন করে ৩০০টি ট্রলি যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া লাগেজ ব্যবস্থাপনায় কর্মীদের শরীরে বডি ক্যামেরা যুক্ত করা হয়েছে এবং যাত্রীরা এখন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে লাগেজ পাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
শফিকুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, আখতারুজ্জামানের প্রতিবাদের ফলে বিমানবন্দরের যাত্রীসেবায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাতে তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করেন জামায়াত আমির।
আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলাকে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনা দুঃখজনক। তাঁর মতে, এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে।
গ্রেপ্তার ও মামলার বিষয়ে যা জানা গেছে
গত ১ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি ব্যবস্থাপনা এবং ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্বকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার ঘটনা ঘটে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ওই ঘটনায় বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আখতারুজ্জামানের দুর্ব্যবহার, হুমকি এবং এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আনা হয়।
২ অক্টোবর ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পরে নিম্ন আদালতে তাঁর জামিন আবেদন নাকচ হয়।
গত ১ নভেম্বর হাইকোর্ট তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। রাষ্ট্রপক্ষ ওই আদেশ স্থগিত চেয়ে চেম্বার আদালতে আবেদন করলেও ২ নভেম্বর আদালত কোনো আদেশ দেননি। ফলে হাইকোর্টের জামিন বহাল থাকে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল ১০টার দিকে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফারুক আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
কারামুক্তির পর আখতারুজ্জামানের বক্তব্য
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান তাঁর গ্রেপ্তার ও কারাবাসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, প্রবাসীদের ভোগান্তি নিয়ে বিমানবন্দরে প্রতিবাদ করার কারণে তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে কারাবরণ করতে হতে পারে, তবে তাতে প্রতিবাদ থেমে থাকা উচিত নয়। তাঁর দাবি, গ্রেপ্তারের ঘটনায় সরকারের প্রতিশোধমূলক আচরণের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে।
গ্রেপ্তারের সময় গোয়েন্দা পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিশেষ করে মামলার তদন্তাধীন অবস্থায় তাঁর বাসায় গোয়েন্দা পুলিশের উপস্থিতি এবং তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর বিষয়ে প্রশ্ন করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করেন।
আখতারুজ্জামান জানান, প্রবাসীদের অধিকার ও বিমানবন্দরে তাঁদের সেবার মান উন্নয়নে কাজ চালিয়ে যেতে চান। এ লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামীর অনুমতি নিয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর এলাকায় প্রবাসীদের জন্য একটি রিসেপশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। নেতারা আখতারুজ্জামানকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
