লরির ধাক্কায় বাস উল্টে প্রাণ গেল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর, মহাসড়ক-রেলপথ অবরোধে অচল সীতাকুণ্ড

৬ মিনিটে পড়ুন২ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) প্রধান ফটকের সামনে লরির ধাক্কায় একটি লোকাল বাস উল্টে গিয়ে চাপা পড়ে মাইশা মুশফিরাত (২১) নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও দুই শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সহপাঠীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও পাশের রেলপথ অবরোধ করেন। এতে সড়ক ও রেল যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটে এবং মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীতে ডালাস পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত মাইশা মুশফিরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বটকাটিয়া গ্রামে। তিনি সাখাওয়াত হোসেন ও সালমা আক্তার দম্পতির মেয়ে।

যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালে দুটি ভারী লরি পাশাপাশি চলাচল করছিল। এ সময় একটি লরি অন্যটিকে অতিক্রম করার চেষ্টা করলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনে থাকা ৮ নম্বর রুটের একটি লোকাল বাসকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে উল্টে গিয়ে সেখানে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে।

দুর্ঘটনার সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অবস্থান করছিলেন। বাসের নিচে চাপা পড়ে মাইশাসহ তিন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন ও সহপাঠীরা দ্রুত তাঁদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক মাইশাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আহত দুই শিক্ষার্থী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। আহত রাজিয়া সুলতানা চমেক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

দুর্ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজেও দুটি লরির প্রতিযোগিতামূলকভাবে চলাচল এবং একটি লরির ধাক্কায় বাসটি উল্টে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাঁচ দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের অবরোধ

সহপাঠীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে নিকটবর্তী রেলপথেও অবস্থান নেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায় নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

তাঁদের উত্থাপিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

প্রথমত, দুর্ঘটনায় জড়িত লরি ও বাসের চালক এবং মালিককে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।

দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে মহাসড়কের উভয় পাশে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী লরির ডিপোর অবৈধ পার্কিং বন্ধ করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

চতুর্থত, ক্যাম্পাসের সামনে যানবাহনের বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানে গতিরোধক স্থাপনের পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে।

পঞ্চমত, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তাকর্মী বাড়াতে হবে।

কেডিএস লজিস্টিকসের লরি নিয়ে প্রশ্ন

দুর্ঘটনায় জড়িত লরিটি কেডিএস লজিস্টিকসের বলে দাবি করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে ভারী যানবাহনের চলাচল ও পার্কিংয়ের কারণে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

তবে সংশ্লিষ্ট লরির মালিকানা, চালকের পরিচয় এবং দুর্ঘটনার জন্য কার দায় কতটুকু, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

বারআউলিয়া হাইওয়ে থানার পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় জড়িত দুটি লরি ও লোকাল বাসটি উদ্ধার করে থানার হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আহতদের উদ্ধারে পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন কাজ করেন।

১০ কিলোমিটার যানজট, ব্যাহত সড়ক ও রেল যোগাযোগ

শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে।

দীর্ঘ সময় যানবাহন আটকে থাকায় যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। একই সঙ্গে রেলপথে শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে ট্রেন চলাচলও বিঘ্নিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে পুরোনো উদ্বেগ

আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের কুমিরা ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এই মহাসড়ক ব্যবহার করে ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতে হয়।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ব্যস্ত মহাসড়ক পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ অবকাঠামো না থাকায় তাঁদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ ও যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের দাবি তাঁরা আগেও জানিয়েছেন।

এবারের দুর্ঘটনায় একজন শিক্ষার্থীর প্রাণহানি এবং আরও দুজনের আহত হওয়ার পর সেই নিরাপত্তা দাবিগুলো আবারও সামনে এসেছে।

মাইশা মুশফিরাতের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহন দুটি ও সংশ্লিষ্ট বাস পুলিশি হেফাজতে রয়েছে। শিক্ষার্থীরা তাঁদের দাবি বাস্তবায়নের জন্য মহাসড়ক ও রেলপথে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।