তাহসিফকে বারে মদ ঢেলে দিচ্ছিলেন দীপ, নিজে পান করেননি: রিমান্ডে দিশার দাবি

৫ মিনিটে পড়ুন৩ বার পড়া হয়েছে

সাবেক বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। উত্তরার একটি বারে মৃত্যুর আগে তাহসিফ, তাঁর বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশা এবং বন্ধু শাহরিয়ার রেজা দীপ একসঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে দিশা দাবি করেছেন, ওই সময় দীপ বারবার তাহসিফের গ্লাসে মদ ঢেলে দিচ্ছিলেন, তবে নিজে পান করছিলেন না।

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার দিশা ও দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তাঁদের দেওয়া বক্তব্য, দুই পরিবারের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে মৃত্যুর আগের রাতের ঘটনাপ্রবাহ জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত দ্বিতীয় দফায় দীপকে আরও তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। এর আগে দিশা ও দীপকে চার দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

বারে তিনজনের অবস্থান

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ যান দিশা। কিছুক্ষণ পর পৃথক মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছান দীপ। পরে তিনজন একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করেন।

সেখানে তাঁরা প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান করেন। রাত ১১টা ৫১ মিনিটে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে যান।

রিমান্ডে দিশা তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, বারে অবস্থানকালে দীপ বারবার তাহসিফকে মদ ঢেলে দিচ্ছিলেন। তবে দীপ নিজে মদ পান করেননি। দিশার দেওয়া এই বক্তব্যের সত্যতা সম্পর্কে তদন্তকারীদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত তথ্য জানানো হয়নি।

টঙ্গীর মাজার বস্তিতে যাওয়ার তথ্য

দিশার ভাষ্য অনুযায়ী, টঙ্গীতে যাওয়ার পর তাহসিফ তাঁকে হেরোইন সেবনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে তিনি তাতে রাজি হননি এবং তাহসিফকে নিষেধ করেছিলেন।

দিশা আরও দাবি করেছেন, পরিচয়ের পর তাহসিফ তাঁকে দুবার টঙ্গীর মাজার বস্তিতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তাহসিফ হেরোইন সেবন করতেন এবং দীপও নিয়মিত তাঁর সঙ্গে থাকতেন।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দিশাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পর তাহসিফ ও দীপের টঙ্গীর মাজার বস্তিতে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। সেখানে যাওয়ার কারণ, তাঁদের অবস্থানের সময় এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

প্রায় দুই ঘণ্টা ওই এলাকায় অবস্থানের পর দীপ একা ফিরে আসেন বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে জানা গেছে। তাহসিফের মোটরসাইকেলও মাজার বস্তি এলাকায় পড়ে ছিল।

ইয়াবা লেনদেনের বিষয়েও তথ্য

তাহসিফের মৃত্যুর তদন্তে ‘আশা’ নামের আরও এক তরুণীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে। রিমান্ডে দিশা তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, ওই নারীর সঙ্গে তাহসিফের ২০০ পিস ইয়াবা লেনদেনের বিষয়ে আলোচনা চলছিল। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন তিনি।

এ ছাড়া ডায়না নামের এক তরুণী ও তাঁর স্বামী রাসেলের কথাও দিশার বক্তব্যে এসেছে। তাঁদের উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরে একটি ট্রাভেল এজেন্সি রয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দিশার দাবি অনুযায়ী, তাহসিফ, দীপ, আশা, ডায়না ও তাঁর স্বামী একই সামাজিক পরিমণ্ডলে চলাফেরা করতেন। তাঁদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও আড্ডা হতো। কখনো ট্রাভেল এজেন্সিতেও তাঁদের আড্ডা বসত।

তদন্তের প্রয়োজনে রাসেল, ডায়না ও আশাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। আপাতত তাঁদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে।

তাহসিফের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দুই পরিবারের ভিন্ন বক্তব্য

তাহসিফের সঙ্গে দিশার সম্পর্কের বিষয়টি নিয়েও দুই পরিবারের বক্তব্যে অমিল পাওয়া গেছে।

তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিমের দাবি, দিশা নিজেই তাঁর ছেলেকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে তাহসিফ তাঁকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন না। অন্যদিকে, দিশার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, তিনি স্বভাবগতভাবে শান্ত ও চুপচাপ ছিলেন। পরিবারের সঙ্গে খুব বেশি খোলামেলা কথা বলতেন না।

পরিবারের সদস্যরা জানান, একপর্যায়ে দিশার চলাফেরায় পরিবর্তন লক্ষ করেন তাঁরা। তাহসিফের সঙ্গে দেখা করতে তিনি বিভিন্ন অজুহাতে বাসা থেকে বের হতেন এবং অনেক সময় রাতে দেরিতে ফিরতেন। বিষয়টি জানার পর তাঁকে বাসায় আটকে রাখা, গেট তালাবদ্ধ করা এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার মতো পদক্ষেপও নিয়েছিল পরিবার।

ডিজিটাল তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ

নৌ পুলিশের মিডিয়া শাখার পুলিশ সুপার মাসুমা আক্তার জানিয়েছেন, দিশা ও দীপের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

তদন্তকারীরা তাহসিফ, দীপ ও দিশার কললিস্ট, ডিজিটাল তথ্য এবং বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছেন। বিশেষ করে মৃত্যুর আগের রাতে তাঁদের চলাফেরা ও যোগাযোগের ধারাবাহিকতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে উত্তরার রাজাবাড়ি ঘাট এলাকায় তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তাঁর বাবা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

বর্তমানে দীপ ও দিশার দেওয়া বক্তব্য যাচাই এবং তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।