যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক অগ্রগতি, চাপে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি

১৪ মিনিটে পড়ুন৩ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রাথমিক ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আসনে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। বিশেষ করে নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকানদের দখলে থাকা সিনেট আসন পুনরুদ্ধার এবং জর্জিয়া ও নিউ হ্যাম্পশায়ারে জয় দলটিকে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তবে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ এখনো নিশ্চিত হয়নি।

৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন কেবল কংগ্রেসের আসন পুনর্বণ্টনের লড়াই নয়; বরং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের অর্থনৈতিক, অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির প্রতি ভোটারদের মূল্যায়ন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এবারের নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, অভিবাসন নীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড। এসব ইস্যুতে ভোটারদের অসন্তোষ নির্বাচনী প্রতিযোগিতার গতিপথে প্রভাব ফেলেছে।

নির্বাচনটি কেন অন্যবারের চেয়ে আলাদা?

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চার বছর অন্তর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে কংগ্রেসের নির্বাচনকে বলা হয় মিডটার্ম বা মধ্যবর্তী নির্বাচন।

এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হচ্ছেন না। বরং প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসন, সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি এবং ৩৬টি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

TRT World-এর নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে থাকা স্বতন্ত্র সদস্যসহ ডেমোক্র্যাটপন্থীদের আসন ছিল ৪৭টি। প্রতিনিধি পরিষদেও রিপাবলিকানরা ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটরা ২১৪টি আসন নিয়ে এগিয়ে ছিল। একজন স্বতন্ত্র সদস্য এবং দুটি শূন্য আসনও ছিল।

প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ২১৮টি আসন প্রয়োজন। অন্যদিকে সিনেটে প্রয়োজন ৫১টি। নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদে অন্তত তিনটি এবং সিনেটে চারটি আসন বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল বলে জানিয়েছে AP।

এই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ট্রাম্প নিজে ব্যালটে না থাকলেও নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত করেছে দুই দল। ফলে ভোটারদের একটি বড় অংশ স্থানীয় প্রার্থীর পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ডের প্রতিও নিজেদের সমর্থন বা বিরোধিতা প্রকাশের সুযোগ হিসেবে নির্বাচনটিকে দেখছেন।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ

এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রার ব্যয়।

Reuters/Ipsos-এর ৩ নভেম্বর প্রকাশিত জরিপে ১ হাজার ৭৬৫ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের মতামত নেওয়া হয়। নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ জীবনযাত্রার ব্যয়কে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও মূল্যবোধ নিয়ে উদ্বেগকে প্রধান বিষয় বলেছেন ২৬ শতাংশ এবং অভিবাসনকে বলেছেন ১৩ শতাংশ।

জরিপে আরও দেখা যায়, ৪৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফেরার পর তাঁদের পারিবারিক আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। মাত্র ১৩ শতাংশ মনে করেন তাঁদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে।

ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু নিত্যপণ্যের ব্যয়, জ্বালানি ও আবাসন খরচ নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত থাকায় সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

CBS News-এর প্রাথমিক এক্সিট পোলেও দেখা গেছে, ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন ৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট বা ক্ষুব্ধ।

Reuters/Ipsos-এর জরিপে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। ভোট দেওয়া বা দেওয়ার পরিকল্পনা করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের ভোট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে; ২৫ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা ট্রাম্পকে সমর্থন জানাতে ভোট দিচ্ছেন। বাকি ২৫ শতাংশের কাছে ট্রাম্প ভোটের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নন।

এটি নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। কারণ প্রেসিডেন্টকে ঘিরে অসন্তোষ কংগ্রেস নির্বাচনের ভোটেও প্রভাব ফেলছে।

ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব

২০২৬ সালের নির্বাচনকে আগের অনেক মধ্যবর্তী নির্বাচন থেকে আলাদা করেছে ইরান যুদ্ধ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সামরিক সংঘাত ফেব্রুয়ারি থেকে মার্কিন রাজনীতিতে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সংঘাতের প্রভাব জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। ফলে জ্বালানির দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ আরও বেড়েছে।

Reuters/Ipsos-এর জরিপ অনুযায়ী, ৫৫ শতাংশ ভোটার মনে করেন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার মূল্য যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সার্থক হয়নি। বিপরীতে ২৫ শতাংশ মনে করেন, সামরিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা ছিল। ১৮ শতাংশ এ বিষয়ে নিশ্চিত নন।

CBS-এর এক্সিট পোলেও দেখা গেছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিষয়ে অধিকাংশ ভোটার মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন। এমনকি রিপাবলিকান ভোটারদের একটি অংশও এ পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।

অর্থাৎ এবারের নির্বাচনে শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি নয়, ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিও ভোটারদের মূল্যায়নের মুখে পড়েছে।

অভিবাসন ও গণতন্ত্র নিয়ে দুই দলের ভিন্ন অবস্থান

অভিবাসন নীতি রিপাবলিকানদের প্রচারণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) কার্যক্রমকে দলটি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে।

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা অভিবাসন কার্যক্রমে অতিরিক্ত কঠোরতা, আটক, অভিযান এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

Reuters-এর নির্বাচনী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অভিবাসন বিষয়ে দুই দলের মধ্যে তীব্র বিরোধ রয়েছে। এ ছাড়া গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি ক্ষমতার ব্যবহার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়েও ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

CBS-এর জরিপে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার সরকারি দুর্নীতিকে ভোটের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার মনে করেন, ট্রাম্প দেশের স্বার্থের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন।

এ ধরনের মনোভাব ডেমোক্র্যাটদের প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কেন ডেমোক্র্যাটরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় পাচ্ছে?

নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি কারণ সামনে আসে।

প্রথমত, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পবিরোধী ভোটারদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় প্রার্থীদের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তৃতীয়ত, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসন ব্যয়ের মতো সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে প্রচারণার কেন্দ্রে রেখেছে।

নর্থ ক্যারোলাইনার ফলাফল এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সাবেক গভর্নর রয় কুপার রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করে সিনেট আসনটি জয় করেছেন। এর ফলে দীর্ঘদিন পর অঙ্গরাজ্যটি থেকে একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হচ্ছেন।

AP-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কুপারের জনপ্রিয়তা, গভর্নর হিসেবে তাঁর পূর্ববর্তী ভূমিকা এবং স্বতন্ত্র ভোটারদের সমর্থন তাঁকে নির্বাচনে সুবিধা দিয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের কৃষ্ণাঙ্গ ও তরুণ ভোটারদের সমর্থনও তাঁর পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অন্যদিকে হোয়াটলি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালালেও নর্থ ক্যারোলাইনার অনেক ভোটার তাঁকে ট্রাম্পের প্রতি অতিরিক্ত অনুগত বলে মনে করেছেন।

এ ছাড়া নিউ হ্যাম্পশায়ারে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ক্রিস পাপাস রিপাবলিকান জন সুনুনুকে পরাজিত করেছেন। জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।

AP-এর ভোটার জরিপে আরও দেখা গেছে, ৩০ বছরের কম বয়সী ভোটারদের প্রায় ৭০ শতাংশ তাঁদের এলাকার প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই বয়সী ভোটারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি কাছাকাছি ছিল।

তবে তরুণ ভোটাররা মোট ভোটারের প্রায় ১০ শতাংশ হওয়ায় তাঁদের অবস্থান পরিবর্তনের প্রভাবও সামগ্রিক ভোটের একটি অংশেই সীমাবদ্ধ।

প্রাথমিক ফলাফলে কারা এগিয়ে?

বাংলাদেশ সময় ৪ নভেম্বর সকাল পর্যন্ত প্রকাশিত নির্বাচনী ফলাফলে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলই গুরুত্বপূর্ণ কিছু জয় পেয়েছে।

সিনেটের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল:

  • নর্থ ক্যারোলাইনা: ডেমোক্র্যাট রয় কুপার রিপাবলিকান মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসনটি পুনরুদ্ধার করেছেন।
  • জর্জিয়া: ডেমোক্র্যাট জন অসফ রিপাবলিকান মাইক কলিন্সকে হারিয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
  • নিউ হ্যাম্পশায়ার: ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাস রিপাবলিকান জন সুনুনুকে পরাজিত করে ডেমোক্র্যাটদের আসনটি ধরে রেখেছেন।
  • ভার্জিনিয়া: ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
  • ফ্লোরিডা: রিপাবলিকান অ্যাশলি মুডি বিশেষ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট অ্যাঞ্জি নিক্সনকে পরাজিত করেছেন।

প্রতিনিধি পরিষদে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল:

নর্থ ক্যারোলাইনার ১১তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাট জেমি এজার রিপাবলিকান জেনিফার বালকমকে পরাজিত করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী সমর্থন থাকা জেলাটিতে এই ফলাফল বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

ফ্লোরিডার পুনর্নির্ধারিত কয়েকটি কংগ্রেশনাল আসনেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা জয় ধরে রেখেছেন।

গভর্নর নির্বাচনে:

পেনসিলভানিয়ায় জশ শাপিরো, ইলিনয়ে জে বি প্রিটজকার, মেরিল্যান্ডে ওয়েস মুর এবং ম্যাসাচুসেটসে মাউরা হিলি পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।

অন্যদিকে ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান প্রার্থী বায়রন ডোনাল্ডস গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন।

এই ফলাফলগুলো দেখাচ্ছে, নির্বাচনে দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা এখনো রাজ্য ও অঞ্চলভেদে ভিন্ন চিত্র ধারণ করছে।

নির্বাচনে আরেকটি বড় বিষয়: আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ

২০২৬ সালের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্নির্ধারণের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে কোন দল কতটি আসন পাবে, তা অনেকাংশে কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের সীমানার ওপর নির্ভর করে।

CBS News জানিয়েছে, রিপাবলিকানরা সাতটি অঙ্গরাজ্যে সীমানা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে ১৫টি আসনে নিজেদের নির্বাচনী সুবিধা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ায় ডেমোক্র্যাটরাও পাঁচটি আসনে সীমানা পরিবর্তন করেছে, যাতে রিপাবলিকানদের সুবিধা কমে আসে।

তবে ফ্লোরিডায় রিপাবলিকানদের অনুকূলে পুনর্নির্ধারিত কয়েকটি আসনেও ডেমোক্র্যাটরা জয় ধরে রেখেছেন।

এটি প্রমাণ করে, শুধু নির্বাচনী এলাকার সীমানা পরিবর্তন করলেই ভোটারদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

এআই ও ডেটা সেন্টারও নির্বাচনী ইস্যু

এবারের নির্বাচনে নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণ।

Reuters/Ipsos-এর জরিপে ৪২ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার জানিয়েছেন, এআই প্রযুক্তির জন্য নির্মিত ডেটা সেন্টারের বিস্তার সীমিত করা তাঁদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথবা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিদ্যুৎ ব্যবহার, স্থানীয় পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তির কারণে সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগের ফলে বিষয়টি নির্বাচনী আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রযুক্তি ও এআই নিয়ে জনমত যে ক্রমশ নির্বাচনী সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে উঠছে, এবারের নির্বাচন তার একটি উদাহরণ।

নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের ক্ষমতায় কী প্রভাব ফেলবে?

এই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন হলো, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষ কিংবা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য পরিস্থিতি কতটা পরিবর্তিত হবে।

প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনিক নীতির বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বাধা বাড়তে পারে।

ডেমোক্র্যাটরা কোনো একটি কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত, শুনানি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে পারবেন। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে প্রেসিডেন্টের মনোনীত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের বিষয়েও তাঁদের প্রভাব বাড়বে।

তবে কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালেই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের নির্বাহী ক্ষমতা বজায় রাখবেন। তিনি কংগ্রেসে পাস হওয়া কোনো বিল ভেটো দিতে পারবেন। আবার অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করতে সিনেটে ৬০ ভোটের প্রয়োজনীয়তাও একটি বড় বাধা।

আলজাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এমনকি ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা এবং সিনেটের ফিলিবাস্টার পদ্ধতির কারণে বড় ধরনের আইনগত পরিবর্তন বাস্তবায়নে বাধা থাকবে।

শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াচ্ছে?

এখন পর্যন্ত প্রকাশিত ফলাফলে ডেমোক্র্যাটরা নর্থ ক্যারোলাইনার গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসন পুনরুদ্ধার করেছে এবং জর্জিয়া ও নিউ হ্যাম্পশায়ারের আসন ধরে রেখেছে। প্রতিনিধি পরিষদেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে তাদের জয় এসেছে।

অন্যদিকে ফ্লোরিডার সিনেট ও গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জয় দেখিয়েছে যে দলটির ভোটভিত্তি এখনো সক্রিয় রয়েছে।

তবে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের মতো সব আসনের ফলাফল এখনো ঘোষণা হয়নি। ভোট গণনা, নির্বাচনী ফলাফলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং অঙ্গরাজ্যভিত্তিক প্রত্যয়ন প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কংগ্রেসের চূড়ান্ত রাজনৈতিক চিত্র নিশ্চিত হবে না।

TRT World-এর নির্বাচনী ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীর জয় ঘোষণা বা প্রক্ষেপণ এবং অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ফল প্রত্যয়ন এক বিষয় নয়। ফলে এবারের নির্বাচনের চূড়ান্ত রাজনৈতিক তাৎপর্য নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের দুই কক্ষের আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশের পর।

এবারের নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল ও জনমত জরিপে সবচেয়ে স্পষ্ট যে বিষয়টি দেখা যাচ্ছে, তা হলো—মার্কিন ভোটারদের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনীতি, যুদ্ধ এবং প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব ইস্যুতে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলকেই ভোটারদের মূল্যায়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে।


Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।