জুতো পালিশ থেকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট: লুলা দা সিলভার জীবনসংগ্রাম

৯ মিনিটে পড়ুন৪ বার পড়া হয়েছে

ব্রাসিলিয়া: শৈশবে দারিদ্র্যের কারণে জুতো পালিশ করেছেন, রাস্তায় বিক্রি করেছেন চীনাবাদাম। কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে হারিয়েছেন বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুল। শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে কারাবরণ করেছেন। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির মামলায়ও কারাগারে যেতে হয়েছে তাঁকে। এত প্রতিকূলতা পেরিয়ে আবারও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।

৮০ বছর বয়সী এই বামপন্থি নেতার রাজনৈতিক জীবন দারিদ্র্য, শ্রমিক আন্দোলন, নির্বাচনী পরাজয়, আইনি লড়াই এবং ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস। ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে ডানপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এতে ব্রাজিলের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।

দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে শৈশব

লুলা দা সিলভার জন্ম ১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পারনামবুকো রাজ্যের গরানহুনস শহরে। দরিদ্র কৃষক পরিবারের আট সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম।

শৈশবে পরিবারের আর্থিক সংকট ছিল তীব্র। খরা ও খাদ্যসংকটের কারণে তাঁর মা সন্তানদের নিয়ে উন্নত জীবনের আশায় সাও পাওলোতে চলে যান। দীর্ঘ ও কষ্টকর যাত্রার পর পরিবারটি সেখানে পৌঁছায়। কিন্তু নতুন জায়গায়ও তাঁদের জীবন সহজ হয়নি।

অভাবের কারণে অল্প বয়সেই কাজ শুরু করতে হয় লুলাকে। তিনি জুতো পালিশ করতেন, রাস্তায় চীনাবাদাম বিক্রি করতেন এবং বাড়ি বাড়ি চিঠি বিলি করতেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে একটি স্ক্রু কারখানায় নিয়মিত শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন।

পরে কারিগরি শিক্ষা নিয়ে ধাতু প্রক্রিয়াকরণ ও যন্ত্রাংশ তৈরির কাজে দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা থাকলেও কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন সংকটের সঙ্গে পরিচিত করে তোলে।

কারখানার শ্রমিক থেকে শ্রমিক নেতা

কারখানায় কাজ করার সময় একটি দুর্ঘটনায় বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুল হারান লুলা। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ ও অধিকার নিয়ে তাঁর উদ্বেগ বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে যুক্ত হন তিনি।

১৯৭৫ সালে সাও বার্নার্দো দো কাম্পো ও দিয়াদেমা অঞ্চলের ধাতব শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন লুলা। সংগঠনটি প্রায় এক লাখ শিল্পশ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করত।

১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে ব্রাজিলের সামরিক শাসনের সময় শ্রমিকদের বড় ধরনের ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন তিনি। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তাঁর নেতৃত্ব তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে।

তবে এই আন্দোলনের কারণে সামরিক সরকারের সঙ্গে তাঁর সংঘাত তৈরি হয়। ১৯৮০ সালে জাতীয় নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তিনি। টানা ৩১ দিন কারাগারে থাকতে হয় তাঁকে।

কারাবাস ও শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাকে আরও দৃঢ় করে। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসেন লুলা।

রাজনীতিতে প্রবেশ ও ধারাবাহিক পরাজয়

১৯৮০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শ্রমিক নেতা, বুদ্ধিজীবী ও সামাজিক আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে বামপন্থি ওয়ার্কার্স পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন লুলা। দলটি শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের অধিকারকে রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে।

তবে রাজনীতিতে তাঁর উত্থান ছিল না সরলরেখায়। ১৯৮২ সালে সাও পাওলোর গভর্নর নির্বাচনে পরাজিত হন। এরপর ১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চূড়ান্ত পর্বে হেরে যান। ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের নির্বাচনেও পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে।

পরপর নির্বাচনী ব্যর্থতার পর রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আনেন লুলা। শুধু বামপন্থি সমর্থকদের ওপর নির্ভর না করে মধ্যপন্থি ভোটার ও ব্যবসায়ী মহলের সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করেন। ২০০২ সালের নির্বাচনে ব্যবসায়ী জোসে অ্যালেনকারকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী করে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলেন তিনি।

অবশেষে ২০০২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হন লুলা। তাঁর এই বিজয় দেশটির রাজনীতিতে শ্রমিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা একজন নেতার ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

সামাজিক নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য হ্রাসের উদ্যোগ

প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম দুই মেয়াদে লুলা সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন। দরিদ্র পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য ‘বোলসা ফ্যামিলিয়া’ কর্মসূচি তাঁর সরকারের অন্যতম পরিচিত উদ্যোগ হয়ে ওঠে।

এই কর্মসূচির আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতো। শিশুদের স্কুলে উপস্থিতি এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের মতো বিষয়ও কর্মসূচির শর্তের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

লুলার শাসনামলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, দারিদ্র্য হ্রাস এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্য ও কাঁচামাল রপ্তানি থেকেও ব্রাজিল অর্থনৈতিক সুবিধা পায়।

তাঁর প্রথম দুই মেয়াদে ব্রাজিলের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির গুরুত্ব বাড়ে। ২০০৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হয়ে ২০১০ সালে দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ করেন তিনি। এরপর তাঁর রাজনৈতিক সহযোগী দিলমা রুসেফ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন।

ক্যানসার, দুর্নীতির মামলা ও কারাবাস

ক্ষমতা ছাড়ার পরও লুলার জীবনে প্রতিকূলতা শেষ হয়নি। ২০১১ সালে তাঁর ক্যানসার শনাক্ত হয়। চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি।

এরপর ব্রাজিলে দুর্নীতিবিরোধী তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। একটি অ্যাপার্টমেন্ট ও খামারবাড়ি ঘুষ হিসেবে গ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাসকে ঘিরে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে।

২০১৭ সালে তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের এপ্রিলে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের পর কুরিতিবা শহরে ৫৮০ দিন কারাবন্দি ছিলেন তিনি। তাঁর সমর্থকেরা এই সময়জুড়ে মুক্তির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যান।

তবে ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর মামলার সাজা বাতিল করে। আদালত জানায়, সংশ্লিষ্ট মামলায় বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়ে সমস্যা ছিল এবং মামলাটি বিচারের ক্ষেত্রে এখতিয়ারসংক্রান্ত ত্রুটি ছিল। এর ফলে লুলা রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পান এবং আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।

তৃতীয়বার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন

২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থি নেতা জইর বলসোনারোকে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন লুলা। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।

শপথ অনুষ্ঠানে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা ছিল তাঁর রাজনৈতিক বার্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই বলসোনারোর সমর্থকদের একটি অংশ ব্রাসিলিয়ায় সুপ্রিম কোর্ট, জাতীয় কংগ্রেস ও প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে হামলা চালায়। লুলার সরকার ওই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে।

তৃতীয় মেয়াদে সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করা, আমাজন বনাঞ্চলে অবৈধ বৃক্ষনিধন কমানো এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় ব্রাজিলের ভূমিকা জোরদার করার উদ্যোগ নেয় তাঁর সরকার।

তবে তাঁর সরকারের সামনে দ্রব্যমূল্য, ঋণের উচ্চ সুদ, অপরাধ দমন এবং রাজনৈতিক বিভাজনের মতো চ্যালেঞ্জও ছিল।

চতুর্থবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত

২০২৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলার সামনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো।

৪ অক্টোবরের প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও এগিয়ে ছিলেন। ফলে চূড়ান্ত ফল নির্ধারণের জন্য দ্বিতীয় দফার ভোট অনুষ্ঠিত হয় ২৫ অক্টোবর।

দ্বিতীয় দফায় লুলা প্রায় ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ফ্লাভিও বলসোনারো পান প্রায় ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ৪৪ লাখ। প্রথম দফায় পিছিয়ে থাকার পর দ্বিতীয় দফায় জয়ী হওয়াকে ব্রাজিলের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে নির্বাচনের ফল নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। তিনি ফল বাতিলের দাবি তোলার কথা জানিয়েছেন। ফলে নতুন মেয়াদ শুরুর আগেই ব্রাজিলের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ

চতুর্থ মেয়াদে লুলার সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ মোকাবিলা এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতা তৈরি করা।

ব্রাজিলের কংগ্রেসে বিরোধীদের শক্ত অবস্থান থাকায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আইনপ্রণেতাদের সমর্থন প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখা এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া, শৈশবে জুতো পালিশ করা, কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করা এবং একাধিকবার রাজনৈতিক ও আইনি সংকটের মুখোমুখি হওয়া লুলা দা সিলভার জীবন ব্রাজিলের রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়।

তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা যেমন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও সামাজিক কল্যাণের প্রশ্নকে সামনে এনেছে, তেমনি তাঁর শাসনামল ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্কও অব্যাহত রয়েছে। চতুর্থ মেয়াদে তিনি এসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করেন, তা ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।