পাসপোর্ট বাতিলের পরও ব্রাজিল ছাড়লেন ফ্লাভিও, পৌঁছালেন যুক্তরাষ্ট্রে
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হারের পর দেশটির সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন ডানপন্থী নেতা ও সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে আর্জেন্টিনা ও ইকুয়েডর হয়ে বুধবার (২৮ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মায়ামিতে অবতরণ করেন তিনি। এর আগে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পাসপোর্ট জমা না দেওয়ায় তাঁর ব্রাজিলীয় ও কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ফ্লাভিও ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রবেশের জন্য ভিসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে পরাজিত হন ৪৫ বছর বয়সী ফ্লাভিও। তবে নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেওয়ার ঘোষণা না দিয়ে তিনি অনিয়মের অভিযোগ তোলেন এবং ফল চ্যালেঞ্জ করার কথা বলেন।
আদালতের নির্দেশ ও পাসপোর্ট বাতিল
নির্বাচনে পরাজয়ের পর ফ্লাভিওকে ঘিরে আইনি জটিলতা আরও বেড়েছে। অর্থ পাচারসংক্রান্ত তদন্তের অংশ হিসেবে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা জমা না দেওয়ায় কর্তৃপক্ষ তাঁর ব্রাজিলীয় ও কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করে।
আদালতের নির্দেশের পর ফ্লাভিও কোথায় আছেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ব্রাজিলের পুলিশ সূত্র জানায়, নিয়মিত অভিবাসনপথে তাঁর দেশ ছাড়ার কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছিল না। অন্যদিকে তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা তাঁর অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
এরই মধ্যে ফ্লাভিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তাঁকে জানানো হয়েছে। তবে তিনি নির্দেশ মানবেন এবং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালাবেন বলেও জানিয়েছিলেন।
আর্জেন্টিনা হয়ে ইকুয়েডর, এরপর মায়ামি
পরে আর্জেন্টিনার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানায়, মঙ্গলবার রাতে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করেন ফ্লাভিও। তাঁরা ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে সংযুক্তকারী তানক্রেদো নেভেস আন্তর্জাতিক সেতু দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেন। এরপর আর্জেন্টিনার পুয়ের্তো ইগুয়াসু থেকে বেসরকারি উড়োজাহাজে ইকুয়েডরের গুয়ায়াকিলে যান তাঁরা।
উড়োজাহাজটি সেখানে যাত্রাবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার দিকে রওনা হয়। বুধবার সকালে মায়ামির কাছে ওপা-লকায় নির্বাহী বিমানবন্দরে সেটি অবতরণ করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উড়োজাহাজটির গতিপথ ও অবতরণের তথ্য উঠে আসে।
তবে আর্জেন্টিনায় প্রবেশের সময় ফ্লাভিও ঠিক কোন পরিচয়পত্র বা ভ্রমণ নথি ব্যবহার করেছিলেন, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য থেকে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। তাঁর ব্রাজিলীয় পাসপোর্ট বাতিলের বিষয়টি এবং সীমান্ত অতিক্রমের সময় ব্যবহৃত নথি—দুটি আলাদা বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন
ফ্লাভিওর যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর ঘটনা ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লাভিও ও তাঁর পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের বিষয়ে সমর্থন জানিয়েছিলেন। পরে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের ভিসা দেওয়ার কথা জানানো হয়।
লুলা প্রশাসন ও বলসোনারো পরিবারের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ দীর্ঘদিনের। লুলা অভিযোগ করেছেন, বলসোনারো পরিবারকে আবার ক্ষমতায় ফেরানোর প্রচেষ্টায় ওয়াশিংটনের ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প বলসোনারো পরিবারের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত এবং ব্রাজিলের নির্বাচনের ফল নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
ফ্লাভিওর বাবা ও ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোও ২০২২ সালে লুলার কাছে নির্বাচনে হারের পর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। পরে ব্রাজিলে ফিরে অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রের মামলায় দণ্ডিত হন তিনি। ফলে ছেলের বর্তমান দেশত্যাগের ঘটনা ব্রাজিলের রাজনীতি ও বলসোনারো পরিবারের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
তদন্তের মুখে ফ্লাভিও
ফ্লাভিও বলসোনারো দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগসংক্রান্ত তদন্তের মুখে রয়েছেন। এসব অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ চলছে; তবে তিনি অন্যায় করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। নির্বাচনে পরাজয়ের পর সিনেটের সদস্য হিসেবে তাঁর মেয়াদ শেষ হলে সংসদীয় দায়মুক্তিও হারানোর কথা রয়েছে।
এখন তাঁর দেশত্যাগকে কেন্দ্র করে ব্রাজিলের কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের ফলে চলমান তদন্তে কী প্রভাব পড়বে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে নির্বাচনের ফল নিয়ে বিরোধ, আদালতের নির্দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে ঘটনাটি দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
