গণভোটে বিচ্ছিন্নতার প্রস্তাব নাকচ, কানাডার সঙ্গেই আলবার্টা

৭ মিনিটে পড়ুন৪ বার পড়া হয়েছে

সর্বশেষ হালনাগাদ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৭:০২ অপরাহ্ন

কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পথে এগোনোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ আলবার্টার ভোটাররা। প্রাথমিক ফলাফলে প্রায় ৭৬ শতাংশ ভোটার কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে এবং প্রায় ২৪ শতাংশ বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে মত দিয়েছেন। সোমবার (১৯ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত গণভোটের এ ফল প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির জাতীয় ঐক্য রক্ষার প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করেছে। একই সঙ্গে আলবার্টার স্বাধীনতার দাবিতে সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর জন্য এটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্বাধীনতার প্রশ্নে আসলে কী ছিল গণভোটে?

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলবার্টায় অনুষ্ঠিত এ গণভোট ছিল দেশটি থেকে সরাসরি স্বাধীন হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভোট নয়। বরং প্রদেশটির বাসিন্দারা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, কানাডার অংশ হিসেবে থাকবে আলবার্টা, নাকি বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে ভবিষ্যতে একটি বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে।

কানাডার জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিবিসি (CBC) প্রাথমিক ফলাফলের ভিত্তিতে কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষের জয় ঘোষণা করে। ভোট গণনার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সম্পন্ন হওয়ার সময়ই এ পক্ষ ৭৬ শতাংশ সমর্থন পায়। পরবর্তী প্রাথমিক ফলাফলেও একই ধরনের ব্যবধান দেখা যায়। ফলে স্বাধীনতার পক্ষে প্রচার চালানো গোষ্ঠীগুলোর প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ নিজে স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিলেও প্রদেশে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন নিরসনের যুক্তিতে গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড কনজারভেটিভ পার্টির ভেতরেও বিচ্ছিন্নতাবাদী অংশের চাপ ছিল।

কেন কানাডা ছাড়তে চায় আলবার্টার একাংশ?

আলবার্টা কানাডার পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। বিপুল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতের কারণে দেশটির অর্থনীতিতে প্রদেশটির বড় ভূমিকা রয়েছে। প্রদেশটিতে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আলবার্টার স্বাধীনতার পক্ষে প্রচার চালানো গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, প্রদেশটির বিপুল জ্বালানি সম্পদ থেকে অর্জিত রাজস্বের একটি বড় অংশ অন্য অঞ্চলের উন্নয়নে ব্যয় হয়। একই সঙ্গে কানাডার কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবেশনীতি, তেল উত্তোলন ও পাইপলাইন নির্মাণসংক্রান্ত বিধিনিষেধ আলবার্টার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে তাদের দাবি।

বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মতে, স্বাধীন রাষ্ট্র হলে আলবার্টা নিজেদের জ্বালানি সম্পদ ও রাজস্বের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে এবং অর্থনীতি ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় কেন্দ্রীয় সরকারের বিধিনিষেধ নিয়ে অসন্তোষও আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সংগঠিত হতে সাহায্য করেছে। তবে প্রদেশটির দীর্ঘদিনের কেন্দ্রবিরোধী মনোভাব অতীতে ব্যাপক স্বাধীনতাকামী সমর্থনে রূপ নেয়নি।

ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠদের আগ্রহ ঘিরে বিতর্ক

আলবার্টার স্বাধীনতার দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের আগ্রহ কানাডার রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আলবার্টাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের একজন ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ইলন মাস্কও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আলবার্টার কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার পক্ষে মন্তব্য করেছেন।

এ ছাড়া আলবার্টা প্রস্পেরিটি প্রজেক্টের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব যোগাযোগের উদ্দেশ্য ছিল আলবার্টা স্বাধীন হলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও সহযোগিতার বিষয়টি বোঝা।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এর আগে বলেছেন, নাগরিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের অংশ হিসেবেই এসব বৈঠক হয়েছে এবং কোনো গোষ্ঠীকে সমর্থন বা আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি।

ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যযুদ্ধ এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিষয়ে তাঁর আগের মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী কার্নি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বিদেশি শক্তির কার্যক্রম কানাডার জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করার চেষ্টা করতে পারে।

জাতীয় ঐক্যের পক্ষে প্রচার কার্নির

গণভোটের আগে আলবার্টায় জাতীয় ঐক্যের পক্ষে প্রচার চালান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি ভোটারদের কানাডার সঙ্গে থাকার আহ্বান জানান এবং বিচ্ছিন্নতার উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি বিভাজনের ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরেন।

আলবার্টায় বেড়ে ওঠা কার্নি প্রদেশটির বাসিন্দাদের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অসন্তোষের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আলবার্টার জ্বালানি সম্পদকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কানাডার অবস্থান শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

প্রাদেশিক সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে আলবার্টার অপরিশোধিত তেল রপ্তানি সম্প্রসারণে নতুন পাইপলাইন প্রকল্প নিয়েও কাজ চলছে। কার্নি প্রশাসনের লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কানাডার জ্বালানি রপ্তানির জন্য আরও বিকল্প তৈরি করা।

প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশের পর কার্নি বলেন, আলবার্টার মানুষ জাতীয় ঐক্যের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথও কানাডার সঙ্গে থাকা এবং ঐক্যবদ্ধ দেশের মধ্যে আলবার্টার অবস্থান শক্তিশালী করার পক্ষে ভোটারদের সমর্থনকে স্বাগত জানিয়েছেন।

পরাজয়ের পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা

গণভোটে পিছিয়ে পড়লেও স্বাধীনতাকামী নেতারা আন্দোলন বন্ধের ঘোষণা দেননি। আলবার্টা প্রস্পেরিটি প্রজেক্টের নেতা জেফরি রাথ বলেছেন, স্বাধীন আলবার্টা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তাঁর মতে, গত এক বছরে আন্দোলনটি প্রদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে।

এদিকে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সংগঠনও আলবার্টার স্বাধীনতার প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের সঙ্গে কানাডার কেন্দ্রীয় সরকারের ঐতিহাসিক চুক্তি রয়েছে, যা আলবার্টা প্রদেশ প্রতিষ্ঠারও আগের। বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়ায় এসব চুক্তি ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার কীভাবে বিবেচিত হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন হিসেবে রয়েছে।

আলবার্টার গণভোটের ফল আপাতত কানাডার জাতীয় ঐক্যের পক্ষে গেলেও প্রদেশটির অর্থনৈতিক স্বার্থ, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি এবং স্বাধীনতার দাবি নিয়ে বিরোধ পুরোপুরি শেষ হয়েছে—এমনটি বলার সুযোগ নেই। বরং ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় সরকার ও আলবার্টার প্রাদেশিক সরকারের সম্পর্ক, জ্বালানি সম্পদের ব্যবস্থাপনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্যিক টানাপোড়েন এ বিতর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।