নির্বাচনের আগে ইসরায়েলে ফিলিস্তিনবিরোধী বক্তব্যের তীব্রতা, এক বছরে নথিভুক্ত ২২৭ মন্তব্য
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও জাতীয় পরিচয়কে ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে ততই তীব্র হচ্ছে বিতর্ক। গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নের আহ্বান, তাদের জাতীয় পরিচয় অস্বীকার এবং আরব নাগরিকদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো বক্তব্য উঠে আসছে রাজনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের কথায়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওফেকের নথিতে চলতি বছরে দেশটির সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিকদের ২২৭টি বিতর্কিত মন্তব্য স্থান পেয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে এ ধরনের বক্তব্যের ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর বিস্তার নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—ফিলিস্তিনবিরোধী বিদ্বেষমূলক ভাষা কি ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে?
এক বছরে ২২৭টি বিতর্কিত মন্তব্য
ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে উসকানিমূলক বক্তব্য পর্যবেক্ষণকারী গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওফেক (OFEK) দেশটির রাজনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া ২২৭টি চরমপন্থী মন্তব্যের একটি তালিকা তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এপিকে এই তথ্য সরবরাহ করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব বক্তব্যের অধিকাংশই গাজা উপত্যকা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিকদের বিরুদ্ধেও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করা হয়েছে। এসব নাগরিকের ভোট দেওয়া ও সরকারি পদে দায়িত্ব পালনের অধিকার রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রযুক্তির মাধ্যমে বিতর্কিত বক্তব্য আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। ইসরায়েলের ভুয়া তথ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফেকরিপোর্টারের প্রতিষ্ঠাতা আচিয়া শ্যাৎজ দেশটির রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ভাষা দেশটির জনপরিসরে ক্রমেই পরিচিত হয়ে উঠছে।
গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নের আহ্বান
প্রতিবেদনে তুলে ধরা সবচেয়ে বিতর্কিত বক্তব্যগুলোর একটি এসেছে জেহুত পার্টির নেতা মোশে ফেইগলিনের কাছ থেকে। তিনি গাজার বাসিন্দাদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য করার আহ্বান জানান। এ জন্য পানি সরবরাহ বন্ধ করার মতো পদক্ষেপের কথাও বলেন। এমনকি গাজার বাসিন্দাদের হত্যা করার পক্ষে চরম মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, সাবেক জিম্মি ইতান মরের বাবা ও নির্বাচনী প্রার্থী জভিকা মোর বলেছেন, গাজাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখাই যথেষ্ট নয়; সেখানকার বাসিন্দাদের বিতাড়িত করতে হবে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ গাজায় সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সমর্থন নিয়ে গাজা ধ্বংস করার মাধ্যমে তিনি পরিবর্তন এনেছেন। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও বলেছেন, তাঁরা গাজায় ফিরে যাচ্ছেন এবং গাজা তাঁদের।
এ ধরনের বক্তব্য গাজার ভবিষ্যৎ, ফিলিস্তিনিদের সেখানে বসবাসের অধিকার এবং সংঘাতের পর ভূখণ্ডটির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—এসব প্রশ্নকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে।
ফিলিস্তিনি পরিচয় অস্বীকার ও আরব নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা
ইসরায়েলের প্রবাসীবিষয়ক ও ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলাবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি মন্তব্য করেছেন, ফিলিস্তিনি পরিচয় বলে কিছু নেই। অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিন শহর সম্পর্কে ইসরায়েলি আইনপ্রণেতা ইৎজিক ক্রয়জার বলেছেন, সেখানে কোনো নিরপরাধ বেসামরিক মানুষ কিংবা শিশু নেই।
এ ধরনের বক্তব্য বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে সংঘাতের সময় বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার নীতি গুরুত্বপূর্ণ; কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয়ের ভিত্তিতে সবাইকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ইসরায়েলের আরব নাগরিকেরাও বিতর্কিত বক্তব্যের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। আইনপ্রণেতা জভি সুকোত আরব আইনপ্রণেতাদের ‘পঞ্চম স্তম্ভ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁদের বিরুদ্ধে হামাসের প্রতি সমর্থনের অভিযোগ তুলেছেন।
এ ছাড়া আইনপ্রণেতা লিমর সোন হার-মেলেখ আরব চিকিৎসাকর্মীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে মন্তব্য করে বলেছেন, যেসব প্রতিষ্ঠানকে তিনি সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক বলে মনে করেন, সেখান থেকে পড়াশোনা করা ব্যক্তিদের ইসরায়েলের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে, আইনপ্রণেতা আমিত হালেভি অধিকৃত পশ্চিম তীরের কৃষিপণ্য নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক আনুগত্য, পেশাগত যোগ্যতা ও জাতীয় পরিচয় নিয়েও বিতর্ক তৈরি হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচার ঘিরে বিতর্ক
আগামী ২৭ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘ডানপন্থা অথবা ফিলিস্তিন’ অর্থবোধক স্লোগান ব্যবহার করছেন। সমালোচকদের মতে, এর মাধ্যমে ভোটারদের সামনে তাঁর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী সরকার এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে পরস্পরবিরোধী বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নেতানিয়াহু নিজে তাঁর কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের মতো সরাসরি চরম ভাষা ব্যবহার করেননি। তবে তাঁর নির্বাচনী স্লোগান নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। বিরোধীদের একাংশের মতে, এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারকে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিতর্কিত ইস্যুতে পরিণত করছে।
সরকারের বিচারমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনসংক্রান্ত নীতির প্রসঙ্গে বলেছেন, সেখানে যা ঘটছে, শেষ পর্যন্ত গাজাতেও তা ঘটতে পারে। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ নেগেভ ও গ্যালিলি অঞ্চলে ‘ইহুদিকরণ’ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা বলেছেন এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের সঙ্গে এর তুলনা করেছেন।
এসব বক্তব্যের কারণে ভূমি, বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ অধিকার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নীতি ও পদক্ষেপের বাস্তব প্রভাবও আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
যুদ্ধের পর থেকে বিদ্বেষমূলক ভাষা নিয়ে উদ্বেগ
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। সেই সময় ইসরায়েলের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী গাজার প্রসঙ্গে ‘মানবপশু’ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ উত্থাপনের সময় এ ধরনের বক্তব্যের উল্লেখ করে। ইসরায়েল অবশ্য গণহত্যার অভিযোগ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
বর্তমান রাজনৈতিক বক্তব্যগুলো দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ ভাষার ব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ, রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য জনপরিসরে কোনো জনগোষ্ঠী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের সহিংসতার সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা
ফিলিস্তিনবিরোধী বক্তব্যের পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রতিবেদনে পশ্চিম তীরের লুব্বান আল-শারকিয়া গ্রামের ফিলিস্তিনি বাসিন্দা মুআয়াদ ওয়াইসের দোকানের সামনে ইসরায়েলি পতাকা স্থাপন করে প্রবেশপথ বাধাগ্রস্ত করার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। পতাকাগুলো সরানোর চেষ্টা করলে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
ওয়াইসের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও হয়রানি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের চলাচলে চেকপোস্ট ও বিভিন্ন বাধা রয়েছে। বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অপরাধের কার্যকর তদন্তের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে।
রাজনীতিকদের বিতর্কিত বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের প্রতিটি সহিংস ঘটনার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত না হলেও, একই সময়ে বিদ্বেষমূলক ভাষা এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
নির্বাচনের আগে কোন পথে ইসরায়েলের রাজনীতি?
আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে ফিলিস্তিনিদের জাতীয় পরিচয়, গাজা থেকে বিতাড়ন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং আরব নাগরিকদের অধিকার ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এক বছরে ২২৭টি বিতর্কিত মন্তব্যের তথ্য দেশটির রাজনৈতিক বক্তব্যের ধরন নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
নির্বাচনী প্রচারে ফিলিস্তিনবিরোধী বক্তব্যের ব্যবহার দেশটির সামাজিক বিভাজনকে আরও গভীর করবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে এসব বক্তব্যের বিস্তার জনমতকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, ফিলিস্তিনিদের অধিকার, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং অধিকৃত ভূখণ্ডে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্ন ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
