জ্বালানি সংকটে ইউরোপে বিক্ষোভ, বাড়ছে কট্টর ডানপন্থীদের সমর্থন

৬ মিনিটে পড়ুন৪ বার পড়া হয়েছে

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে কেন্দ্র করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন রূপ নিয়েছে বৃহত্তর অসন্তোষে। ইতালিতে কৃষক ও পরিবহনশ্রমিকদের প্রতিবাদ, পর্তুগালে আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ এবং স্পেনে বাড়িভাড়া ও উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী বছরের নির্বাচন সামনে রেখে ফ্রান্স, জার্মানিসহ কয়েকটি দেশে কট্টর ডানপন্থী ও জনতুষ্টিবাদী রাজনৈতিক দলগুলো অর্থনৈতিক অসন্তোষকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছে।

ফ্রান্সে শিক্ষা ও জীবনযাত্রার সংকট ঘিরে বিক্ষোভ

ফ্রান্সের প্যারিসের উত্তরাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষকসংকট ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমিক ও অন্যান্য শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ দিয়েছেন। জ্বালানি, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। লিমোজ শহরের ১৯ শতকের একটি টাউন হলেও আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বিক্ষোভকারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ ও দাবিকে যৌক্তিক বলে স্বীকার করেছেন। তবে সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের এক করে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। আন্দোলনের মুখে ফরাসি সরকার বিদ্যালয়ে বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী বছরের এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে ইউরোপের অর্থনীতি

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ইউরোপের জ্বালানি বাজার ও বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। ইউরোপীয় কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতের কারণে বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বিঘ্ন ঘটায় ইউরোপের আনুমানিক ১০০ বিলিয়ন ইউরো বা ১১২ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। একই প্রতিবেদনে গ্যাসের দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধি এবং ডিজেলের দাম দ্বিগুণ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

জ্বালানির উচ্চমূল্য শুধু সাধারণ মানুষের পরিবহন ব্যয় বাড়াচ্ছে না, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের খরচও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে খাদ্যপণ্যের দাম, ব্যবসার পরিচালন ব্যয় এবং পরিবারের দৈনন্দিন খরচ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিনের মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে নতুন জ্বালানিসংকট যুক্ত হওয়ায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারকে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে।

ইতালি, পর্তুগাল ও স্পেনেও বাড়ছে অসন্তোষ

ইতালির মিলানে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে বিক্ষোভের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সিসিলি দ্বীপের গেলা শহরে কৃষকেরা জ্বালানির উচ্চমূল্যের প্রতিবাদে ট্রাক্টর নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। তাঁদের অভিযোগ, কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি চালানোর খরচ এতটাই বেড়েছে যে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ট্রাকচালক, কৃষক ও ইস্পাতশ্রমিকদের অবরোধে পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কোথাও জ্বালানির স্থানীয় সংকট এবং সুপারমার্কেটে পণ্য সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে কম মজুরি, বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ মিছিলে অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে, স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী এক নারীকে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা আবাসনসংকট ও অতিরিক্ত ভাড়ার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন জোরদার করেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশটিতে আগামী নভেম্বরের আগাম নির্বাচনও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। বেলজিয়ামেও বিক্ষোভ হয়েছে। আর আলবেনিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ, কর্মসংস্থানের অভাব ও শিক্ষার মান নিয়ে ক্ষোভ থেকে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে দেশভেদে এসব আন্দোলনের কারণ ও দাবি এক নয়।

নির্বাচনের মাঠে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা কট্টর ডানপন্থীদের

ফ্রান্সে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালি দলের নেতা মেরিন লে পেন জ্বালানির ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে এই প্রস্তাব সমর্থন পাচ্ছে। অন্যদিকে, বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশঁও জ্বালানির মূল্যকে তাঁর রাজনৈতিক প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় করেছেন। জরিপের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর লে পেনের জনসমর্থনে উন্নতি হয়েছে, অন্যদিকে মাখোঁর জনপ্রিয়তা কমেছে।

জার্মানিতে কট্টর ডানপন্থী অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দল জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে সরকারের সমালোচনার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। দলটি রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দেশটিতে সেপ্টেম্বরে জ্বালানিসংক্রান্ত মূল্যস্ফীতি ১৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা এএফডির সরকারবিরোধী প্রচারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ইতালিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা রবার্তো ভান্নাচ্চির নেতৃত্বাধীন নতুন কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল ফিউচারও রাশিয়ার সঙ্গে গ্যাস সরবরাহের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের পক্ষে কথা বলছে। পোল্যান্ডে কনফেডারেশন অব দ্য পলিশ ক্রাউন দলের নেতা গ্রজেগর্জ ব্রাউন রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস কেনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি, রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করলে ব্যয় কমতে পারে। তবে এমন প্রস্তাব ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে ইউরোপের প্রচলিত রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ইউরোপে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে মানুষের ক্ষোভ নির্বাচনী রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা আগামী বছরের নির্বাচনগুলোতে আরও স্পষ্ট হতে পারে।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।