হুথি হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবে টাইফুন যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য

৬ মিনিটে পড়ুন৪ বার পড়া হয়েছে

ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করতে টাইফুন যুদ্ধবিমান পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। সৌদি আরবের শহর, বেসামরিক জনগণ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে আকাশপথের হামলা থেকে সুরক্ষা দিতে এসব যুদ্ধবিমান প্রতিরক্ষামূলক অভিযান পরিচালনা করবে। পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে একটি এ৪০০এম বিমান এবং সৌদি বাহিনীকে সহায়তায় সামরিক উপদেষ্টা পাঠাবে ব্রিটেন। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ ঘোষণা দেয়। ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়া এবং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

আকাশ প্রতিরক্ষায় দায়িত্ব পালন করবে টাইফুন

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) টাইফুন যুদ্ধবিমান সৌদি আরবের আকাশসীমায় প্রতিরক্ষামূলক অভিযান পরিচালনা করবে। এর লক্ষ্য হবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মতো আকাশপথের হুমকি মোকাবিলা করে সৌদি শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা।

ব্রিটিশ সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, এসব যুদ্ধবিমান হুথি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক হামলা চালাবে না। বরং সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করতে সহায়তা করবে।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং হুথিদের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিশেষ করে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করা পরিস্থিতির উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। তাঁর মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষা করা যুক্তরাজ্যের জাতীয় অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।

সামরিক সহায়তায় যুক্ত হচ্ছে পরিবহন বিমান ও উপদেষ্টা

টাইফুন যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি সৌদি আরবে একটি এ৪০০এম সামরিক পরিবহন বিমান পাঠাবে যুক্তরাজ্য। বিমানটি দেশটির অভ্যন্তরে প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সামরিক উপকরণ পরিবহনে সহায়তা করবে। এ ছাড়া ব্রিটিশ সামরিক উপদেষ্টারা সৌদি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করবেন।

এর আগে গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে অতিরিক্ত সহায়তার ঘোষণা দিয়েছিল ব্রিটেন। সে সময় সৌদি বাহিনীর বিমান অভিযানে জ্বালানি সরবরাহের জন্য আরএএফের একটি ভয়েজার উড়োজাহাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এবার সেই সহায়তার সঙ্গে টাইফুন যুদ্ধবিমান, পরিবহন বিমান ও সামরিক উপদেষ্টা যুক্ত হচ্ছে।

ব্রিটিশ সরকার সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামূলক বিমান অভিযানে আকাশ থেকে জ্বালানি সরবরাহের সহায়তা আরও ৯০ দিন বাড়ানোরও ঘোষণা দিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: টাইফুন যুদ্ধবিমানগুলো সৌদি আরবের আকাশসীমা রক্ষায় প্রতিরক্ষামূলক দায়িত্ব পালন করবে। অন্যদিকে, জ্বালানি সরবরাহের সহায়তা সৌদি বাহিনীর বিস্তৃত বিমান অভিযানের অংশ, যার মধ্যে সৌদি ও ইয়েমেনি জনগণের জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী হুথি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে অভিযানও রয়েছে।

ইয়েমেনে নতুন করে তীব্র হচ্ছে সংঘাত

সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা বাড়ানোর ঘোষণা এসেছে ইয়েমেনে প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর। সোমবার (১৯ অক্টোবর) ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শাবওয়া প্রদেশের আল-আলাম সামরিক প্রশিক্ষণশিবিরে হুথিদের হামলায় প্রথমে অন্তত ৬০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরবর্তী প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩ জনে পৌঁছানোর কথা জানানো হয়। আহত হয়েছেন আরও দুই শতাধিক মানুষ।

নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন নতুন নিয়োগ পাওয়া নিরাপত্তাকর্মী। হামলাটি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইয়েমেনের সংঘাতের অন্যতম প্রাণঘাতী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার হুথিদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ চলছে। ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী দেশটির রাজধানী সানা ও বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার বিভিন্ন আঞ্চলিক মিত্রের সহায়তায় নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সহিংসতা কিছুটা কমলেও ২০২৬ সালে নতুন করে লড়াই তীব্র হওয়ায় পরিস্থিতি আবার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।

জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ

সৌদি আরবের নিরাপত্তার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী। ফলে এর জ্বালানি অবকাঠামো বা রপ্তানি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা, পরিবহন ব্যয় এবং পণ্য সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বাড়লে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহে বিঘ্ন এবং ব্রিটিশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোকে লন্ডন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার অংশ হিসেবে দেখছে।

সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনীতির ওপরও জোর

যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, ইয়েমেনের সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কেবল সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভব নয়। দেশটি জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, কূটনৈতিক আলোচনা এবং উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে যাচ্ছে।

ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, সৌদি আরবে টাইফুন যুদ্ধবিমান পাঠানোর সিদ্ধান্ত ইয়েমেন সংঘাতের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাবের প্রতিফলন। ব্রিটেনের এই সহায়তা সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে হুথিদের হামলা, পাল্টা সামরিক তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরে রয়েছে।

Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।